পহেলা বৈশাখ সাধারণ অর্থে শুধু একটি তারিখ নয়; এমনকি নববর্ষও নয়। বাঙালির অকৃত্রিম অস্তিত্বের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের যে সম্পর্ক, তা এতটাই আত্মিক যে, বাঙালি ও পহেলা বৈশাখকে পৃথক করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বাঙালির এ উৎসব আমরা অনুভব করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই। সে জন্যই যদি বলি, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবস আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বকে তুলে ধরে- তাতে যেমন বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই; তেমনি মানতেই হবে পহেলা বৈশাখ আমাদের সামগ্রিক জাতিসত্তাকে উপস্থাপন করে ঐতিহাসিকভাবেই। বস্তুত বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আমাদের সংযোগ বহুকালের; সম্পৃক্তি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও। বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক দিকটিই আমাদের একেবারে মৌলিক দিক এবং এই পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে কেন্দ্র করে বাঙালিকে যেমন লড়তে হয়েছে কিছু উগ্রবাদীর বিরুদ্ধে, তেমনি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও।
বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে এই পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য অন্যরকম হিসাবের খাতায় বিবেচ্য। সে হিসাব ব্যবসার নয়, অর্থের নয়; বাঙালি হিসেবে আমাদের সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানের ভ্রুকুটি ১৯৫২ সালের পর বাংলাদেশের মানুষকে আরেকবার সচেতন করে তোলে- পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষাকেই শুধু নয়; সংস্কৃতিকেও খর্ব করতে চায়। ১৯৫৬ সালে যদিও তারা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল; কিন্তু সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানতে তখনও তারা বদ্ধপরিকর। তারা রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদযাপন কিংবা পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালনকে হিন্দুয়ানি বলে নাকচ করতে চাইল। তারা বুঝল না, বুঝতে চাইল না; যেমনটি এখনও কেউ কেউ বুঝতে চায় না- সংস্কৃতি ও ধর্ম অভিন্ন বিষয় নয়। সেই থেকে শুরু হলো বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। পাকিস্তানি যত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সেই ১৯৬১ সালে কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হয় বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। এই ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ নেয় ছায়ানট। প্রথমে ঢাকার বলধা গার্ডেনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে বরণ করা হয়। সেই সময়ে যারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ওয়াহিদুল হক, সন্‌জীদা খাতুন প্রমুখ।
পুরোনো আমলের বর্ষপঞ্জি বদলিয়ে দিয়ে মুসলমান শাসকরা প্রথমে চালু করেছিলেন হিজরি। কিন্তু তাতে বিপত্তি দেখা গেল খাজনা আদায় করতে গিয়ে। চান্দ্র বছর হিজরি প্রতি বছর ১১ দিন করে এগোতে থাকে এবং এর ফলে কৃষিজমির খাজনা দেওয়ার সময়ের এই পরিবর্তন করদাতাদের সমস্যার মুখে ফেলে। সম্রাট আকবর তখন হিজরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে সৌর বছর চালু করেন, সেটিই হচ্ছে আজকের বঙ্গাব্দ। অতএব বাংলা নতুন বছরের সঙ্গে ধর্মের কোনো রকম সম্পৃক্ততা নেই। যারা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরোধিতা করেছিল, তারা আসলে বাঙালি সংস্কৃতিকেই অবদমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু না, বাঙালি সে কথা মেনে নেয়নি। ক্রমশ বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে পহেলা বৈশাখে জনসমাগম বাড়তে থাকে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে প্রায় কোনো রকম বিরতি ছাড়াই এ উৎসব উদযাপিত হতে থাকে। ব্যতিক্রম ১৯৭১ সাল। তখন পাকিস্তানের দখলদার বাহিনী-অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালন করা সম্ভব হয়নি।
করোনার কারণে জনস্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণেও রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ আয়োজিত হতে পারেনি গত বছর। এ বছরও উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের সব আয়োজন বন্ধ থাকছে। কিন্তু এই প্রকৃত-সঞ্জাত প্রতিবন্ধকতা ছাড়া পহেলা বৈশাখকে বরণ করা বাঙালি বন্ধ করেনি কখনও।
মানতেই হবে, সময়ের একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মাত্রা রয়েছে। সেই ধারা ধরেই সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস ও বছর বদলাতে থাকে নিয়তই। আর বছর বদলের এই দিনটিতে আমরা উল্লসিত হই, নতুনকে আবাহন করি পুরোনোকে পেছনে ফেলে। এই অনুভূতিটা বৈশ্বিক। কিন্তু বাঙালির জন্য পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। আমাদের ভিন্ন জাতিসত্তার পরিচিতি এই পহেলা বৈশাখ। ভৌগোলিক মানচিত্রের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম। আর্থ-রাজনৈতিক বঞ্চনার উপলব্ধির আগেই আমরা অনুভব করলাম আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার নানান ফিকির-ফন্দি। আমাদের বিশুদ্ধ পাকিস্তানি বানানোর প্রয়াসে শুধুই যে মায়ের ভাষা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার সূক্ষ্ণ ষড়যন্ত্র শুরু হলো, তাই-ই নয়; আমাদের মৌলিক সংস্কৃতি থেকেও বিচ্ছিন্ন করার সক্রিয় চেষ্টা করা হলো। পাকিস্তানের পরবর্তী নেতৃত্ব একটি নতুন মুসলিম পাকিস্তানি সংস্কৃতি তৈরির প্রয়াস নেয়। তারা এটাও বুঝল না, দুই অংশে বিভক্ত দেশের কোনো অভিন্ন সংস্কৃতি হতে পারে না। রাজনীতি সংস্কৃতি নির্ধারণ করতে পারে না। সংস্কৃতি মাটি থেকেই উদ্ভূত এক প্রাকৃতিক সত্য। আর বাঙালির সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইটা যদিও শুরু হয় প্রথমত ভাষা দিয়ে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক অর্থে সাহিত্য, সংগীত, পোশাক এবং জীবনাচরণের নানান দিক এতে সম্পৃক্ত হয়। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালির জীবনের সেই বিশেষ একটি দিন, যখন সে তার সার্বভৌম সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিশ্ববাসীর সামনে। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলা নববর্ষের এই সাংস্কৃতিক মাত্রাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চকিত এবং উচ্চারিত হয় বাংলাদেশে। কারণ বাংলাদেশকেই লড়তে হয়েছে তার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য। রমনা উদ্যানের সেই বিখ্যাত বটতলা এখনও বাঙালি সংস্কৃতির যেন এক তীর্থস্থান বাংলাদেশের মানুষের কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ছায়ানট ছাড়াও বহু সাংগীতিক প্রতিষ্ঠান এই পহেলা বৈশাখে নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তাদের মধ্যে রয়েছে সুরের ধারার মতো প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ সবকিছুই বাঙালিকে তার শিকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক

মন্তব্য করুন