গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ১৯৭১-৭২-এর তলাবিহীন ঝুড়ির দেশের তকমা ছুড়ে ফেলে দিয়ে, বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতার স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশাল অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- কৃষি ও শিল্পোৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় মেট্রোরেল এবং এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ইত্যাদি। এ ছাড়া শিক্ষার হার বিশেষ করে নারী শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। দারিদ্র্য এবং অতি দারিদ্র্যের হার অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক কমেছে (যদিও বৈশ্বিক করোনা মহামারির আমলে দারিদ্র্যের হার আবার বৃদ্ধি পেয়েছে)। সবই ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় অর্জন।
সমস্যা হচ্ছে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত করা নিয়ে। বাংলাদেশ কি আসলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় পরিচালিত হচ্ছে? প্রথমেই ধরা যাক, জাতীয়তাবাদের কথা। সংবিধানের দ্বিতীয় অংশে মৌলিক নীতিমালার অধীনে বলা হয়েছে, আমাদের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত, অর্থাৎ আমরা বাঙালি। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে কিছুসংখ্যক মানুষ সচেতনভাবে শুধু নিজেদের বাঙালি বলে দাবি করে। নতুন প্রজন্মের নাগরিকরা নিজেদের বাঙালি হিসেবে ভাবার সুযোগইবা পাচ্ছে কোথায়? কারণ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে তিনটি প্রধান ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। অর্থাৎ বাংলা মাধ্যমের সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা এবং আরবি মাধ্যমের মাদ্রাসা শিক্ষা। এই তিন ধারায় লেখাপড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তিন ধরনের মন-মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে; যারা কোনো দিনই নিজেদের একগোষ্ঠীভুক্ত বলে ভাবতে পারবে না। তাদের অনেকেই নিজেদের জাতীয়তা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে না; বরং জাতীয়তা সম্পর্কে ওরা বিভ্রান্ত। অথচ, ১৯৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তা-ই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে আমাদের চালিত করেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' কী তা বৃহদাংশকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারিনি।
সংবিধানের দ্বিতীয় মূলনীতি সমাজতন্ত্রের কথায় আসা যাক। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হয়তো ১৯৬০-১৯৭০-এর দশকের সমাজতান্ত্রিক মডেল এখন আর বাস্তবসম্মত হবে না। কিন্তু নূ্যনতমপক্ষে একটি নীতি-নৈতিকতাভিত্তিক সমাজ এবং আর্থসামাজিক বিষয়াবলি বিবেচনায় মানুষে-মানুষে ব্যবধান যথাসম্ভব কমিয়ে নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারত। তবে মানুষে-মানুষে বৈষম্য কমানোর কোনো সমন্ব্বিত উদ্যোগ লক্ষণীয় নয়। ১৯৬০-এর দশকে আমরা তদানীন্তন পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজিপতি ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছি। অথচ নিকট-অতীতে 'ক্যাসিনো-কাণ্ড' এবং বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের কাহিনিগুলো ফাঁস হতে থাকলে দেখা গেল বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ইতোমধ্যে ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
সংবিধানের তৃতীয় মূলনীতি গণতন্ত্রের কথায় আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে এদেশে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের যে যুগ শুরু হয়, তাতে সর্বপ্রথমেই গণতন্ত্র এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়। অবশ্য জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যাতে নির্বাচনের ফলাফল তার অনুকূলে যায়। তার ওই অনৈতিক এবং অস্বচ্ছ নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অধিকতর স্বচ্ছ এবং ত্রুটিমুক্ত করার কোনো প্রয়াস পরবর্তীকালে কোনো রাজনৈতিক সরকারের আমলেই পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ, স্বচ্ছ-অবাধ-প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্যে দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন কম হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তাদের সুবিধামতো পরিচালিত করেছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কথা যদি বলি, তাহলে কী দেখি? বিদগ্ধজনদের মতে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যে কোনো দেশে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ওই দেশে বসবাসকারী সব জনগণের (ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-আদিবাসী নির্বিশেষে) কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে মানুষে-মানুষে বৈষম্য নিরসন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজের সর্বস্তরে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। প্রতিটি নাগরিক যাতে তার প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিরাপদে সম্পন্ন করতে পারে ও নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে তা নিশ্চিত করা। অথচ মাসখানেক আগে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে সরকারদলীয় নেতাদের মারামারির ঘটনায় যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তাতে দেখা যায়, সুবিধালোভী আজ্ঞাবহ কর্মীদের কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের অবৈধ ধনসম্পদ অর্জন ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়াই যেন কারও কারোর রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। এরকম দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে।
শেখ হাসিনা '৭১-এর এ দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেছেন (যা এখনও চলমান)। ২০১৩ সাল থেকে যখন উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের রায় ঘোষিত হতে থাকে, তখন দেশপ্রেমিক জনগণ দাবি তুলেছিল বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার করা হোক। কিন্তু সরকার সেদিকে কর্ণপাত করেনি। এই সুযোগে জামায়াত-শিবির চক্র নিজেদের গোপনে সংগঠিত করতে শুরু করে। একইভাবে ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতি কাণ্ডের পর জ্বালাও-পোড়াওসহ চরম ধ্বংসাত্মক অরাজক কর্মকাণ্ডের কাজে লিপ্ত হেফাজতের নেতাকর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে সরকার এই উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীটির কাছে আত্মসমর্পণ করে- এই অভিযোগ ওঠে নানা মহল থেকে। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের এই নমনীয় নীতির কারণেই এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে হেফাজত ও অন্যান্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ২৬ মার্চ হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি অফিস, স্থাপনা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে এবং রাস্তাঘাট ও রেললাইনের ক্ষতিসাধন করে ত্রাসের সৃষ্টি করে। এমনকি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও প্রতিকৃতি ধ্বংস করার ধৃষ্টতা দেখায়। ৩ এপ্রিল সমকালের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের ওই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জামায়াত-শিবির এবং বিএনপির সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে।
আমাদের সংবিধানের চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু জিয়াউর রহমানের 'বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম' এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' সংযোজনের পর আমাদের রাষ্ট্র আর সাংবিধানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থাকল না। উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ জামায়াত-শিবির গোষ্ঠী ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুধু বিরোধিতাই করেনি, হত্যাযজ্ঞেরও অংশীদার। তবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হয়ে দেশ পরিচালনা করলে গণবিরোধী উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে ভয় পাওয়ার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না।
অনারারি অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন