মারাত্মক ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে মানব জাতি এগিয়ে চলেছে। জীবন আক্রান্ত হচ্ছে, প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। প্রায় গোটা বিশ্বে করোনা-দানব মানুষের স্বাভাবিক সব জীবনছন্দ স্তব্ধ করে দিয়েছে। জীবনের জন্য এ এক ভয়াবহ হুমকি। বলা চলে, বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সময়টা কম নয়; এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে করোনার থাবা। কোথাও বা কখনও সংক্রমণের হার একটু কমছে, কোথাও বা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আমাদের অবস্থা এখন তা-ই। আমরা স্বস্তির চৌহদ্দি থেকে আবার বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়লাম। এমন পরিস্থিতিতেই আমরা বরণ করছি নববর্ষকে। গতবারও চিত্র প্রায় এ রকমই ছিল। অর্থাৎ এ নিয়ে টানা দুই বছর আমরা আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য বর্ষবরণ করছি বেদনাবিধুরতার মধ্য দিয়ে। বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের প্রাণবন্ত-উজ্জ্বল-সুন্দর-মানবিক সম্মিলন। কিন্তু আজ আমাদের নেই সেই উচ্ছ্বাস, সেই আয়োজন। নেই সেই জাতিগত সংস্কৃতির আলো। তবুও নববর্ষকে স্বাগত। স্বাগত জানাই গৃহবন্দি থেকেই এই প্রত্যাশায়- অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা, মুছে যাক জরা। কেটে যাক অন্ধকার। আলোর বিচ্ছুরণ ঘটুক সমাজে-পরিবারে সব অঙ্গন-প্রাঙ্গণে। জয় হোক চিকিৎসাবিজ্ঞানের।
বর্ষবরণ বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপরূপ চিত্র। কত কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠছে! মনে নাড়া দিচ্ছে। দুঃসময়ে সাহস-শক্তি সঞ্চারে শক্তিও জোগাচ্ছে। আতঙ্ক নয়; সচেতনতা-সতর্কতায় গোটা বিশ্ব কাটিয়ে উঠুক এ মানবিক বিপর্যয়।
আজকের দিনে তো এমন বেদনাকাতর হয়ে থাকার কথা ছিল না। কি পত্রিকা, কি টেলিভিশনের পর্দা কোনোদিকেই যেন দৃষ্টি ফেলা যায় না। জাপটে ধরে বেদনা। গতবারও যাদের সঙ্গে মনের ভাব আদান-প্রদান করে বর্ষবরণ করেছি; আজ তাদের কেউ কেউ নেই। করোনা-দানব তাদের কেড়ে নিয়ে গেছে আমাদের মাঝ থেকে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-আবিস্কার প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বিশ্বের কত দেশ আজ উৎকর্ষের বিস্ময়কর বিকাশ ঘটিয়ে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে; অনেক কঠিনকে মুঠিবদ্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে! কিন্তু এই যে দীর্ঘ সময় ধরে গোটা বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে যে সংক্রমণ; ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জীবাণু; তাকে তো কেউ পরাস্ত করতে পারছে না! না, আশাহত হতে চাই না, হবোও না। অবশ্যই মানব জাতি জয়ী হবে। আশাবাদী হতে চাই। আশাবাদী থাকতে চাই। প্রতিটি বৈশাখেই আমাদের সংকল্প থাকে সমৃদ্ধ-উন্নত-গর্বিত বাংলাদেশ গঠনের পথ যেন নির্বিঘ্ন হয়। সব প্রতিবন্ধকতা আমরা জয় করতে চাই অসম সাহসে। মানব জাতির জয় হোক, কল্যাণ হোক। উদ্ভাসিত হোক মানবতার আলো।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক শত-সহস্র সংগঠন এই দিনে কত কিছু করে থাকে! সবই মন-প্রাণ জুড়ানো; হৃদয় ভরানো আয়োজন। প্রত্যেকের নজর থাকে নতুন বছরে নতুন কিছু উপস্থাপনার, যা ছাপিয়ে যাবে অতীতকে। বহু বছর পহেলা বৈশাখের বিশাল-বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রধান কেন্দ্র রাজধানীর রমনা বটমূল। বিশ্বের সর্বত্র নববর্ষ উদযাপনের বর্ণিল আয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষবরণ ইতোমধ্যে অতুলনীয় হিসেবে স্বীকৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ইউনেস্কোর তরফে। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য বাংলাদেশের বাঙালির অভিনব আয়োজন নানা দেশের মানুষকে আকর্ষণ করতে শুরু করেছে। হাল আমলে বৈশাখের বাজার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিচিত্র-বহুমুখী করায় যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। কিন্তু দুর্ভাবনা হলো- ধর্মান্ধ, মৌলবাদী চক্র, মতলববাজ মহল দূর হয়ে যাওয়া আবর্জনা আঁকড়ে ধরে রাখতে অপতৎপরতায় মেতে থাকে। পাকিস্তান আমলে তো বটেই; এমনকি স্বাধীন-সার্বভৌম রক্তমূল্যে, বিপুল আত্মত্যাগে অর্জিত এই বাংলাদেশেও পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নানাভাবে বাধা এসেছে। দেওয়া হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের উস্কানি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা মাত্র ক'দিন আগে উদযাপন করলাম। বিস্ময় লাগে, অশ্বভ-অনাকাঙ্ক্ষিত যা কিছুর কবর রচনা করে এই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল; যে সাম্প্রদায়িকতা সমূলে উৎপাটনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ৫০ বছর আগে; সেসব ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে! তখনই প্রশ্নজাগে- এত অর্জনের বিসর্জন ঘটল কীভাবে!
নববর্ষ উৎসব-অনুষ্ঠানের দুটি ছবি- গ্রামীণ ও নাগরিক। আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে এমন দাবি রাখতে পারে যে, একদিকে দুস্থ গ্রামে বর্ণাঢ্য নাগরিক নববর্ষের উদযাপন প্রসারিত করে, সেখানে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুরুজ্জীবন ঘটানো হোক। অন্যদিকে বাঙালিয়ানার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ আদর্শ নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এভাবে গ্রাম-নগরের বাস্তবসম্মত সমন্বয় ঘটানো। অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, জাতীয় জীবনে বাঁকফেরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুধু সংস্কৃতিচর্চার প্রচলিত ধারারই পরিবর্তন ঘটায়নি; রাজনীতিতেও তার সুপ্রভাব ফেলেছে। পড়েছে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনায়, পড়েছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার যাত্রায়। অসাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে বিবেচনা করলে পহেলা বৈশাখ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে নিজস্ব সংস্কৃতির কথা বলি, এর সঙ্গে প্রকৃতির সংলগ্নতা রয়েছে। বৈশাখে প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে- এটাই নববর্ষের অনুভূতি। বাংলা নববর্ষের অন্তর্নিহিত শক্তিই আমাদের সব অন্ধকার দূর করুক। সম্প্রীতির বাংলা নববর্ষে প্রত্যাশা অনেক। জয় হোক শুভ চেতনার, দূর হোক অন্ধকার। আমাদের অগ্রযাত্রার পথও হোক মসৃণ। আগামী দিনগুলোতেও আমরা অবশ্যই একত্র হয়ে আবার গাইব বাঙালিত্ব তথা মানবতার জয়গান। সাংস্কৃতিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী হোক। সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হোক বাংলাদেশ; আমাদের রক্তস্নাত প্রিয় বাংলাদেশ।
সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা-সহিংসতা-বিদ্বেষ এসব প্রতিবন্ধকতা আমরা জয় করতে চাই অসম সাহসে। চলার পথে বাধা-বিপত্তি আসেই। কিন্তু আমাদের নতুন প্রত্যয় হোক- বিপদে যেন ভয় পেয়ে ম্রিয়মাণ হয়ে না যাই। বাংলা নববর্ষ বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ, সর্বজনীন এ উৎসবের মূলে যারা আঘাত করতে চেয়েছে, তা তো চিহ্নিত। তাদের কোনো ছাড় নয়। এই দিন শুধু উৎসবেরই নয়, আত্মিক শক্তি সঞ্চারেরও দিন। মানবিক বোধ বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম উপাদান হিসেবে এর শিকড়সন্ধানী প্রেরণা মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। তাই বর্ষবরণ আমাদের অন্যতম প্রাণের উৎসব। আমাদের চেতনার মর্মমূলে বৈশাখ আরও আত্মসন্ধানী শিকড় গাড়বে- এও আশা করি। ১৪২৭ সন পেরিয়ে আমরা ১৪২৮ সনে প্রবেশ করলাম। এখন একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চাই। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানব জাতি বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ঝড়-ঝাপ্টা অতিক্রম করে। বিদ্যমান সংকটও কাটবে। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি অদৃশ্য করোনা-দানবকে পরাস্ত করবে- এই আশা রাখতে চাই। স্বপ্ন দেখি বিনির্মাণের। স্বপ্ন তো দেখতেই হবে; তা না হলে দুঃস্বপ্নের হাত
থেকে বাঁচব কী করে! যান্ত্রিকতাশূন্য, অমানবিকতাশূন্য একটি গ্রহ চাই মানুষের জন্য। এই গ্রহ যে কোনো প্রাণীর জন্য বিপদমুক্তভাবে বসবাসের যোগ্য হয়ে উঠুক। আরও সৃজনশীল সমাজ দেখতে চাই। মানুষ বাঁচতে চায়, ভালোভাবে বাঁচতে চায়। এই চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃদ্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। আশা মরে না। আশা জিয়ন্ত রাখি। সবার জীবন হোক মঙ্গলময়। কেটে যাক ক্রান্তিকাল।
শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন