দিনলিপিতে ফারিয়া লারা লিখেছিলেন 'শুধু মেঘ আর মেঘ/ শুধু আকাশ আর আকাশ/আমি শুধু জেনে গেছি/ বড্ড বেশি সুন্দর এই পৃথিবীটা।' আকাশ প্রিয় ছিল লারার। ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী শিক্ষার্থীর লারার স্বপ্ন ছিল খোলা আকাশে পাখির মতো ভেসে বেড়ানোর। স্ব্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়ার। কিছুদিনের জন্য সেই স্ব্বপ্ন পূরণও হয়েছিল। তারুণ্যদীপ্ত ও প্রতিভাবান লারার অনেক পরিচয়- পাইলট, লেখক, অনুবাদক, উপস্থাপক, বিতার্কিক, চিত্রকর। নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠালাভে প্রত্যয়ী ছিলেন লারা। শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির আলোকিত ভুবনে। অর্জন করেছিলেন প্রশংসা, জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। সাফ গেমসে ছিলেন লিয়াজোঁ অধিকর্তা। ১৬ এপ্রিল ছিল তার জন্মদিন। বাবা বাংলাদেশ বিমানের জেনারেল ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন এবং মা কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লারা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, গবেষণা, অনুবাদ আর দোভাষীর কাজে অর্থ উপার্জন করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন স্ব্বপ্ন পূরণের। পাইলট হয়ে আকাশের উচ্চতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর বিমান চালানোর স্ব্বপ্ন পূরণে এয়ার পারাবাতের একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন লারা। কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে লাইসেন্স পেয়েছিলেন। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান অধিকারকারী বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক। ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮-এ প্রশিক্ষণের শেষ দিনে বিধ্বস্ত হয় সেসনা-১৫০ বিমানটি। সহপাইলট রফিকুল সুমন এবং লারা, বরিশাল থেকে ঢাকায় ফেরার পথে হঠাৎই দমকা হাওয়ার কারণে জরুরি অবতরণের সময়ে বিধ্বস্ত হয়। হারিয়ে যান স্ব্বপ্নচারী লারা পৃথিবী থেকে অনন্ত আকাশে।
লারা স্ব্বপ্ন দেখতেন সুন্দরের। হৃদয়ের গভীরের ইচ্ছে ছিল, সহায়-সম্বলহীন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। বিমান দুর্ঘটনায় অকালে চলে যাওয়ায় লারার স্ব্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয় ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের সেবাকেন্দ্র। ১৯৯৮ সালে বিমান দুর্ঘটনায় লারার মৃত্যুর পর মা কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন ও বাবা আনোয়ার হোসেন খান, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এ ফাউন্ডেশন। মানুষের সেবাদানের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় স্ব্বপ্নদর্শীর স্মৃতি ও শোককে স্বজনরা রূপান্তরিত করেছেন শক্তিতে। প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছে আর্তমানবতার সেবায়। ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন ২০২১ সালে পহেলা জানুয়ারি ২১ বছরে পদার্পণ করেছে। রাজেন্দ্রপুরের হালডোবায় সড়কের পাশেই ফাউন্ডেশনের সেবাকেন্দ্রের অবস্থান। টেকসই মা ও শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে পাঁচটি গ্রামে উদ্ভাবনী প্রকল্প হিসেবে ১০ হাজার মানুষের সমন্বয়ে কাজ করছে। এসব কাজে আর্থিকভাবে পাশে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল এক্সপোজার, সিঙ্গার, হংকং লিমিটেড ইত্যাদি।
ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের আরেকটি শাখা রয়েছে দেশের সর্বদক্ষিণে বরগুনার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল বামনার ডৌয়াতলা গ্রামে। লারাদের পৈতৃক জমিতে স্থাপিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। বরগুনা জেলার ছয়টি উপজেলায় প্রায় ৪০০টি গ্রামে কাজ করছে ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন। নারী অধিকার, শিশু অধিকার, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, বাল্যবিয়ে রহিত, যৌতুক নিরোধ, যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, অ্যাসিড নিক্ষেপ প্রতিহতকরণে কাজ করছে। এ ছাড়াও মানবাধিকার, জেন্ডার নিরোধসহ সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের মেধা বিকাশে ২০০৮ সাল থেকে বামনা, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বরগুনা সদর- চারটি উপজেলায় 'প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র' পরিচালনা করছে। প্রতি বছর এসব কেন্দ্রে ২০০ শিশুকে শিক্ষা প্রদান করে থাকে ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন। নদী ভাঙনকবলিত বরগুনা জেলার এ চারটি উপজেলায় নদী উপকূলে প্রান্তিক ও স্বল্প ভূসম্পত্তির মালিকদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে 'কৃষি বৈচিত্র্যকরণ ও উন্নয়ন খামার'। এছাড়াও বাস্তুভিটাহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এসব প্রত্যন্ত এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ১০টি বসতি পল্লি। দুস্থ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য স্কুল আর কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। মেয়েদের আবাসনের জন্য নির্মিত হয়েছে ছাত্রীনিবাস। ফারিয়া লারার মৃত্যু হয়েছে কিন্তু তার স্বপ্নের মৃত্যু হয়নি। সাহসী লারা বেঁচে আছেন, এ দেশের মানুষের হৃদয়ে। লারার স্ব্বপ্ন পূরণের ব্রত নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
লেখক, গবেষক; নির্বাহী সদস্য, ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন

মন্তব্য করুন