করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা শেষ পর্যন্ত তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছেই গেল! শুক্র ও শনিবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উভয় দিনই মৃত্যুর সংখ্যা ১০১ জন। বলা বাহুল্য, এমন 'মাইফলক' আমরা কখনও ছুঁতে চাইনি। আমরা বরং চেয়েছি বৈশ্বিক এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সক্ষমতার পরিচয় দিক এবং ক্রমেই মৃত্যুর সংখ্যা ও সংক্রমণের হার শূন্যে নেমে আসুক। মন্দের ভালো হিসেবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। মৃতের সংখ্যা যেমন একক অঙ্কে ছিল, তেমনই সংক্রমণের হারও নেমে এসেছিল পাঁচের নিচে। সেখান থেকে শুক্র ও শনিবারের চিত্র- শতাধিক মৃত্যু ও সংক্রমণের প্রায় ২২ শতাংশ হার অবিশ্বাস্যই মনে হয়। এই আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না, প্রকৃত সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি। কারণ অনেকেই যেমন করোনা পরীক্ষা করছেন না, তেমনই প্রকাশ পাচ্ছে না রোগের লক্ষণ। এদিকে সংক্রমণ ও প্রাণহানির আগের দিনের 'রেকর্ড' পরের দিনই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বলেছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৬টিই এখন সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে।

শনিবার জনস্বাস্থ্যবিদদের বরাত দিয়ে সমকালের একটি প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক যে, সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আরও বাড়তে পারে। তারা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চার সপ্তাহের 'লকডাউন'-এর সুপারিশও করেছেন। শোক ও দহনের যে বিস্তৃতি, দীর্ঘশ্বাসের পরিসর বৃদ্ধি- এ জন্য আতঙ্কিত না হয়ে আমরা যদি যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারি, সচেতনতা-সতর্কতায় যাপিত জীবনে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে পারি, তাহলে এই বৈতরণী পাড়ি দেওয়া কঠিন হবে না। এর বিকল্পও নেই। বাংলাদেশে মোট মৃতের সংখ্যা যখন ১০ হাজার ছাড়িয়েছে; সংক্রমণের সংখ্যা যখন সাত লাখ ছাড়িয়েছে; তখন নতুন দফার শুরু থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সংক্রমণের ঢেউ খাড়াভাবে উঠছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতদিন অব্যাহত থাকবে জনস্বাস্থ্যবিদরাও তা বলতে পারছেন না। এমতাবস্থায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আমরা নিয়ন্ত্রণমূলক পরিস্থিতি থেকে বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়ার পেছনে উদাসীনতা, উপেক্ষা, অবজ্ঞা যে বহুলাংশে দায়ী এই সত্যও এড়ানো যাবে না।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন সংক্রমণ ঠেকাতে ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পথও যেন গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সম্প্রতি সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ মাস ধরে পড়ে আছে অক্সিজেন সরবরাহ সামগ্রী! কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে পড়ে আছে ৩শ' কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র। অথচ আমরা দেখছি, গুরুতর করোনা আক্রান্তরা হাসপাতালে প্রয়োজনে অক্সিজেন পাচ্ছেন না। অক্সিজেন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তাও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী করার অন্যতম কারণ হতে পারে বৈকি। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন দুটি পৃথক প্রকল্পের জীবনরক্ষাকারী এই চিকিৎসাসামগ্রী দুর্যোগকালেও যে পড়ে আছে- এর দায় কার? অদক্ষতা-অবহেলা-নিষ্ফ্ক্রিয়তার এমন নজির সৃষ্টির দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে না।

পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়- এ ব্যাপারে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই অনেকবার সতর্কতা সংকেত দিয়েছি। কিন্তু সকলই গরল ভেল! কেবল মৃত্যু ও সংক্রমণ হারের নতুন নতুন রেকর্ডই চরম সত্য। প্রতিদিন আমাদের যেন হাঁ করে গিলতে আসে, কুরে কুরে খেয়ে যায়। বিলম্বে হলেও আমরা সবার দায়িত্বশীলতা দেখতে চাই। আমরা পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় লাশ সৎকারকারীদের ব্যস্ততা দেখতে চাই না। আমরা মর্মন্তুদ সব খবর আর শুনতে চাই না। যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেন, জীবন আগে এবং জীবনের জন্যই জীবিকা কিন্তু মানুষের অপরিণামদর্শিতা আর অদূরদর্শিতায় যদি করোনার পথ প্রশস্ত হতেই থাকে, তাহলে সংকুচিত হতে থাকবে জীবনের স্রোতধারা। এই পরিণতি কাম্য হতে পারে না। বাঁচতে হলে যেমন জানতে হবে, তেমনি মানতেও হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পরিসরও বাড়াতে হবে প্রয়োজনের নিরিখে। যে দুর্ভাগ্যজনক মাইলফলক আমাদের সামনে প্রতিদিন হাজির হচ্ছে, তার উল্টোপিঠ দেখতে হলে জানা, মানা ও চিকিৎসার বিকল্প কী?

মন্তব্য করুন