হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক সোনারগাঁয়ের রিসোর্টকাণ্ডের পর 'মানবিক বিয়ের' গল্পের অবতারণা করে নিশ্চিতভাবেই মানুষের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করেছেন। বস্তুত বাক্যের মধ্যে 'মানবিক' কথাটা থাকলেই মানুষের সহানুভূতি লাভ করা সহজ হয়। কিন্তু মানুষ এখন অনেক সচেতন। কার্যকারণ সম্পর্ক ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে তবেই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় কোনটা মানবিক আর কোনটা অমানবিক। এই ডিজিটাল যুগে যেখানে ভয়েস রেকর্ডিং, ভিডিও রেকর্ডিং ইত্যাদি এত সহজ, সেখানে মানুষকে বোকা বানানো অত সহজ নয়।
নীতি, নৈতিকতা একটি আপেক্ষিক বিষয়, যা স্থান, কাল, পাত্রভেদে ভিন্ন। সমাজের নীতি-নৈতিকতার বোধ, প্রথা, রীতি ইত্যাদির সাপেক্ষে রাষ্ট্রের আইন প্রণীত হয়, কিন্তু সমাজে বসবাসরত মানুষের সমস্ত নীতি-নৈতিকতার বোধ ও ভাবনা রাষ্ট্রের আইন ধারণ করতে পারে না। সেজন্য নাগরিকের সব আচরণ রাষ্ট্রের আইন দিয়ে বিচার করা যায় না এবং তখনই সমাজের মধ্যকার নীতি-নৈতিকতার বোধ, প্রথা, রীতি ইত্যাদির সাপেক্ষে মানুষের আচরণ ও কর্মকাণ্ড বিচার করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বৈষ্ণবসাহিত্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে মানদণ্ড ধরে বর্তমান সময়ের প্রেমকে যেমন বিচার করা যাবে না, তেমনি পাশ্চাত্যের প্রেমকে বা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে মানদণ্ড ধরে বাংলাদেশের প্রেমের ঘটনা বিচার করা ভুল। তবে পশ্চাৎপদ বাংলাদেশের সমাজ উন্নত আধুনিক দেশের সংস্কৃতি দ্বারা ক্রমশ আকৃষ্ট হতে থাকবে এবং সেদিকে ধাবিত হতে থাকবে ধীরে ধীরে।
কর্তব্য ও বাধ্যবাধকতার নীতিশাস্ত্রের আলোকে নৈতিকতাকে বিচার করার তিনটি ফর্মুলা দিয়েছেন ইমানুয়েল কান্ট :কর্মের ফলাফল বিবেচনা করে নৈতিকতা বিচার করা, কর্মের ফলাফল নির্বিশেষে শুধুই কর্মের ধরন বিবেচনা করে নৈতিকতা বিচার করা এবং কর্মের ফলাফল আন্দাজ করা যায় না অর্থাৎ কর্মের ধরন অস্পষ্ট- এ রকম অবস্থায় মানুষের নিজের জ্ঞান বা বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা নৈতিকতা বিচার করা।
আধুনিক বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি অথবা ধর্মশিক্ষার অনুপস্থিতি পূরণ করেছে নীতিশাস্ত্র, যা মোরাল সায়েন্স বা নীতিবিজ্ঞান হিসেবে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত। নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি যে যুক্তি ও বিজ্ঞান, তা নীতিবিজ্ঞান নামের মধ্যেই পরিস্কার। মানবিকতারও ভিত্তি হলো যুক্তি ও বিজ্ঞান। কী সেই যুক্তি? এক কথায় সাম্য হচ্ছে সেই যুক্তি। অর্থাৎ ধর্মে, বর্ণে, গোত্রে, জাতিতে, নারী-পুরুষে, সাদায়-কালোয়, ধনী-গরিবে, উঁচুতে-নিচুতে, শাসক-জনতায় কোনো রকম ভেদাভেদ থাকলে তাকে মানবিক বলা যাবে না। এখানে বিজ্ঞানের কী ভূমিকা? বিজ্ঞান যুক্তি নির্মাণে সাহায্য করে। যেমন, প্রজনন অঙ্গের পার্থক্য ছাড়া নারী-পুরুষের মধ্যে মেধা-বুদ্ধি ও কর্মক্ষমতায় কোনো পার্থক্য নেই। এটা জানতে হলে আমাদের বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে হবে এবং সেই জ্ঞান নিয়ে আমরা যুক্তি প্রদর্শন করছি যে, নারী-পুরুষে কোনো ভেদাভেদ করা চলবে না। করলে সেটা অমানবিক হবে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি নীতিবিজ্ঞান কবে হবে আমরা জানি না। মামুনুল হক কী কী মিথ্যা বলেছেন, কী কী সত্য গোপন করেছেন, তা পুলিশের দায়িত্ব খতিয়ে দেখা, আদালতের দায়িত্ব তা বিচার করার। কিন্তু কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে আমরা জনগণকে তাদের বোধ ও বিচার-বিবেচনা তৈরিতে সাহায্য করতে পারি।
মামুনুল হকের দাবি, জান্নাত আরা জান্নাত ওরফে ঝর্ণা, তার বিবাহিত দ্বিতীয় স্ত্রী। পত্রিকা ঝর্ণার পিতা-মাতার বরাত দিয়ে জানাচ্ছে যে, তারা এই বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। এ কেমন কথা। মানুষ চায় বৈচিত্র্যের স্বাদ গ্রহণ করতে। আবার আমাদের নৈরাজ্যবাদী হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। আমাদের মানতে হয় রাষ্ট্রের আইন, মানতে হয় সমাজের রীতি-নীতি। তাহলে উপায় কী?
উপায় হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষকে সংযমী করে, সংযত করে, সভ্য করে, অন্যের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত করে। কারণ অনুশাসন হলো বাইরের নির্দেশ, তাই কৃত্রিম। সংস্কৃতি হলো অন্তর্গত, এ হলো ভেতরের সিদ্ধান্ত। আমি অন্যের ক্ষতি করতে পারি না- মানুষের এই বোধ যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সংস্কৃতিবান মানুষ বলা যাবে না। সম্ভবত এ জন্যই মানুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে 'রেশনাল অ্যানিম্যাল' হিসেবে। ড. আহমদ শরীফ এই রেশনালিটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন শ্রেয়-বোধ ও কল্যাণ-চেতনার নিরিখে।
রাষ্ট্রের আইন ও সমাজের রীতি-নীতি আর আমার মন কী করতে চায়- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের সাহায্য করে সংস্কৃতি। আমি যতক্ষণ একজন নারীর প্রতি কমিটেড তথা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকব, ততক্ষণ আমি অন্য কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে যেতে পারি না। আমার বর্তমান স্ত্রী বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক যদি এ রকম খারাপ হয় যে, তার সঙ্গে সহাবস্থানই সম্ভব নয়, তাহলে তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আগে ইতি টানতে হবে এবং কেবল তারপরই আমি অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। বর্তমান স্ত্রী বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে, অন্যের প্রতি ভালো লাগা, ভালোবাসা, এমনকি মনের সেতুবন্ধ রচনাও মানুষের মনের স্বাভাবিক ধর্ম বটে। তবে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মতো সীমা অতিক্রম করার আগে বর্তমানের সঙ্গে সম্পর্কটা ঘোচাতে হবে প্রথম। না হলে তা অনৈতিক হবে।
স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা শুধুই কি ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে? বরং তারা কোলাহল থেকে দূরে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসবে, সমুদ্রে যাবে, স্বপ্টেম্নর ভেলায় ভেসে বেড়াবে, রাত কাটাবে। কিন্তু মামুনুল হকরা কি এ রকম একটি উন্মুক্ত সমাজ চান? মামুনুল হক কি জানেন যে, এই রকম একটি উন্মুক্ত সমাজের জন্য দরকার নারীর শিক্ষা, কর্মের স্বাধীনতা, ক্ষমতা আর নিজের ইচ্ছামতো জীবন পরিচালনার অধিকার? শিক্ষাহীন, সংস্কৃতিহীন, অবরোধবাসিনী নারী সঙ্গীকে আনন্দ দিতে অক্ষম- মামুনুল হকদের তা জানার কথা নয়। তারা আমাদের নিয়ে যেতে চান অতীত অন্ধকারে- যেখানে ফুল ফোটে না, বাঁশি বাজে না, নন্দনতত্ত্বের চর্চা হয় না, ছবি আঁকা যায় না, ছাদের ওপরে কপোত-কপোতিী সারারাত জ্যোৎস্নায় স্নান করে না।

রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর
nntarun@gmail.com

মন্তব্য করুন