এবারের বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য বেশ ভিন্ন। এর কারণ গত এক বছর হলো আমরা করোনা মহামারির বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। মহামারির রূঢ় বাস্তবতা আমাদের শিখিয়েছে যে, আমরা যতই অর্থ-সম্পদে বিত্তশালী হই না কেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকা যায় না। জীবনের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই আসে প্রকৃতি থেকে। বাড়তি কিছু প্রয়োজন আমরা শিল্প কলকারখানাসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে পাই। কিন্তু প্রয়োজনীয় মূল উপকরণগুলো আসে প্রকৃতি থেকে। ফলে কভিড-১৯ বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডারকে ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।
আজ আমরা যখন বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালন করছি, তখন করোনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আরও বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিশ্বে নেতৃত্বের অভাব রয়েছে এবং এ বিষয়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা জানি, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নিঃসরণের জন্য পৃথিবী হুমকির মুখে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে যদি এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হয় তাহলে আর কিছুদিনের মধ্যে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ৫২টি দ্বীপরাষ্ট্র হারিয়ে যাবে। এ ছাড়া ২১৬০ সাল নাগাদ যদি পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে আটকানো না যায়, তাহলে পৃথিবীর সার্বিক ব্যবস্থাপনাই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাবে।
আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ার কারণ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা। বিশ্বে যত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে তার ২৫ শতাংশ আসছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। এসব জ্বালানি উত্তোলনের পর্যায়ে আরও ৬.৩ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জ্বালানি খাত ৩০ ভাগ ভূমিকা রাখছে। আমরা জানি, বন উজাড় হলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়বে। এরপরও আমরা বন উজাড় করছি। এ হার দিন দিন বাড়ছে। কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি ব্রাজিলে কীভাবে বনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
বিশ্বে ২০ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় বন উজাড় হওয়া থেকে। আবার পরিবহনের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ১৩ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার নামে আমরা প্রকৃতিতে নাইট্রো-অক্সাইড নিঃসরণ করছি, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে পৃথিবীকে অনেক বেশি উত্তপ্ত করছে। কিছু কিছু শিল্পে যেমন সিমেন্ট, লোহা, স্টিল, অনেক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাধ্যমে পৃথিবী উত্তপ্ত করে চলেছে।
বাংলাদেশের বিপদ আরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যায় তাহলে উপকূলের ২১টি জেলা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উন্নয়নের নামে পরিবেশ বিপর্যয়ের এই চরম প্রক্রিয়া যুদ্ধ ছাড়াই সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে। এই যে ৫২টি দ্বীপরাষ্ট্র সাগরগর্ভে বিলীন হওয়ার অর্থ হলো ৫২টি জাতিগোষ্ঠী, ৫২টি সংস্কৃতি, ৫২টি পতাকা বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের ভোগবাদী আচরণের জন্য আমরা আমাদের সার্বভৌমত্বকে কেন হারাতে দেব?
ধরিত্রীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রকৃতি এবং এর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। নদী বয়ে সাগরে মিলিত হবে- এটাই চিরন্তন। আমরা যেন এই সত্যকে অস্বীকার করে সেচ প্রকল্প বা ব্যারাজ বানিয়ে নদীর বয়ে চলা বাধাগ্রস্ত না করি।
দুই দশক আগেও আমাদের দেশের অনেক নদী পরিস্কার ছিল। কিন্তু নদীগুলো আর আগের মতো নেই। একই পরিণতি বনগুলোর। আগেকার দিনে বাসে অথবা ট্রেনে করে কোথাও যাত্রা করলে দুই পাশের সবুজ দৃশ্যে চোখ জুড়িয়ে যেত। এখন দুই পাশে সবুজের পরিবর্তে চোখে পড়ে বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য আর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্পের সাইনবোর্ড।

আমাদের শালবন ছিল ৪৪ হাজার একর। মাত্র দুই থেকে তিন দশকের ব্যবধানে সেটাকে আমরা নামিয়ে এনেছি তিন হাজার একরে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে বন হারানোর গড় পরিমাণ এক দশমিক তিন শতাংশ। আর বাংলাদেশে তা দুই দশমিক ছয় শতাংশ। মানুষের সুস্থ পরিবেশের জন্য যে কোনো দেশে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বন বিভাগের তথ্যমতে, আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ ১১ শতাংশ। অবশ্য বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে এটা ছয় শতাংশেরও কম। এ রকম বাস্তবতায় আমরা দুই দশমিক ছয় শতাংশ হারে বন উজাড় করছি কীভাবে?
বিপুল জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে হবে- এ যুক্তিতে আমরা বহুজাতিক কোম্পানির চাপিয়ে দেওয়া কৃষি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমাদের নিজস্ব কৃষি ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার সুযোগ থাকলেও সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আধুনিক কৃষির নামে খাদ্যপণ্যে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার। যা খেয়ে মানুষের মধ্যে নতুন নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কিছু কিছু রোগের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থেকেও বাংলাদেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে চলছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্জন করা। আমরা মাত্র তিন শতাংশ অর্জন করতে পেরেছি। অবশ্য সম্প্রতি ১৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ স্থগিত করা হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস করে আমরা চাহিদার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি।
বাংলাদেশে সূর্যের আলোর অভাব হয় না; কিন্তু আমরা সৌর বিদ্যুতের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারছি না। বলা হচ্ছে- সোলার প্যানেল বসানোর জায়গা নেই। এ যুক্তি ঠিক নয়। বিশ্বের অনেক দেশে কৃষিজমিতে কৃষিকাজ করে ওপরে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। আমাদের সমস্যা সমাধানের মানসিকতা থাকতে হবে। আমাদের আইন আছে, সংবিধানে পরিবেশ রক্ষা করার কথা বলা আছে; কিন্তু আমরা সংবিধানের নির্দেশনা মেনে কাজ করছি না।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় দায় থাকলেও দেশটি দায় অনুযায়ী নেতৃত্ব দিতে পারেনি। উল্টো সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে নিজের দেশকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম পদক্ষেপেই প্যারিস চুক্তিতে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। সে ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বিচারিক ইস্যু। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী তাদের বেশি ভার বহন করতে হবে। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অর্থ দিয়ে নেতৃত্ব দিলে হবে না।
এ বছর বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- 'পুনরুদ্ধার করুন আমাদের পৃথিবী'। শুধু অর্থ দিলেই পৃথিবী আগের অবস্থানে ফিরবে না। অর্থ প্রদানের মাধ্যমে হয়তো দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আপাতত টিকে থাকতে সহযোগিতা করা যাবে। কিন্তু পৃথিবীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে প্রকৃতিকে সম্মান করতে হবে, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে। পৃথিবীতে শুধু মানুষই টিকে থাকবে তা নয়; বরং এখানে সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজাতে হবে। এর উদাহরণ আমাদের সামনে কম নেই। আমরা কিউবা, ভুটানসহ উন্নত অনেক দেশকেও প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে দেখছি। আমাদের কোনোভাবেই জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে যাওয়া যাবে না, অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। সব উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশের বিষয়টি অর্থবহভাবে সন্নিবেশ করতে হবে।
ধরিত্রীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা না গেলে এখানে উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসবে। উন্নত বিশ্ব হয়তো স্বল্প সময়ের জন্য এসব দুর্যোগ সামলাতে পারবে কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব এগুলো সামলে উঠতে পারবে না। কাজেই পৃথিবীর প্রতি, প্রকৃতির প্রতি সুবিচার করতে হবে। প্রকৃতির প্রতি অবিচার করে আমরা কোনো উন্নয়ন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর থেকে কোনো সুফল পাবে না। মুনাফার আগ্রাসন থেকে কৃষি খাত, আবাসন খাত, স্বাস্থ্য খাত বাঁচাতে হবে। এটা করতে হলে প্রকৃতি সুরক্ষিত রাখতে হবে; করপোরেশন সরিয়ে রাষ্ট্রকে পরিচালকের আসনে বসতে হবে। বেসরকারি খাত অবশ্যই থাকবে; কিন্তু এর ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি, বেলা

মন্তব্য করুন