করোনা-দুর্যোগে টিকাপ্রাপ্তির সংকট বিশ্বব্যাপীই বিরাজ করছে। আমরাও এর বাইরে নই। আমাদের টিকাপ্রাপ্তির মূল উৎস ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে চুক্তিমাফিক টিকাপ্রাপ্তিতে বিলম্বিত প্রক্রিয়া যখন দৃশ্যমান, তখনই আশার বার্তা মিলেছে কোভ্যাক্স থেকে। কোভ্যাক্স বাংলাদেশকে চাহিদামাফিক টিকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিনাইজেশনস-গ্যাভির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক উদ্যোগ কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস অ্যাসিলিটি (কোভ্যাক্স) নামক উদ্যোগ থেকে আগামী শনিবারের মধ্যে বাংলাদেশের চাহিদা জানাতে বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, করোনা-দুর্যোগে টিকা যখন 'সোনার হরিণ' হয়ে উঠেছে, তখন কোভ্যাক্সের এই প্রস্তাব নানা প্রশ্নের মধ্যেও আপাতত স্বস্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করবে। আমরা জানি, কোভ্যাক্স টিকা উৎপাদনকারী কোনো সংস্থা নয়। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোভ্যাক্স থেকে গত মার্চের মধ্যে আমাদের বিনামূল্যে কিছু টিকা পাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার পর্যায়ক্রমে ২০ শতাংশকে এই সংস্থাটির টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো টিকা পাওয়া যায়নি।

এমতাবস্থায় নতুন করে কোভ্যাক্সের তরফে বাংলাদেশের প্রয়োজনমাফিক টিকা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি ইতিবাচক। কোভ্যাক্স যেসব উৎপাদক সংস্থার টিকা সংগ্রহ করে সরবরাহ করবে, সেসবই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। বিনামূল্যে কোভ্যাক্সের ২০ শতাংশের বাইরে যে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা জেগেছে, তা আমাদের কিনতে হবে। আমরা মনে করি, কোভ্যাক্সের প্রস্তাব ও টিকাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া নির্ধারণের বিষয়গুলো দ্রুত আমলে নিয়ে সরকারের তরফে যথাযথ উদ্যোগ প্রয়োজন। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট বা কোভ্যাক্সের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সরকারকে টিকা সংগ্রহের অন্যান্য উৎসেও যোগাযোগ করতে হবে। কারণ, বিশ্বের অনেক ধনী দেশও এখন পর্যন্ত চাহিদামাফিক টিকা সংগ্রহ বা মজুদ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় টিকাপ্রাপ্তির জন্য সবারই বাড়তি তৎপরতা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারেও সক্রিয়তা বজায় রাখতে হবে। আমরা জানি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ৫৭ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজের টিকা দিয়েছে। এ ছাড়া ১৬ লাখের বেশি মানুষ দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়েছে।

প্রথম ডোজ দেওয়া প্রত্যেককে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার মতো টিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই। বুধবার সহযোগী একটি দৈনিকে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে টিকা আছে ৩০ লাখেরও কম। প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণকারীরা যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে না পারেন, তাহলে এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। কাজেই সেরাম ইনস্টিটিউট যাতে চুক্তি অনুযায়ী আমাদের টিকা সরবরাহ করে, এ ব্যাপারে জোর কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশে টিকা উৎপাদনের যে পরিকল্পনা রয়েছে, এ ক্ষেত্রেও গতিশীলতা আনা অত্যন্ত জরুরি। টিকা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি, প্রযুক্তি সহায়তা, যথাযথ সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার বিষয়গুলোও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) সম্মেলনের প্ল্যানারি পর্বে মঙ্গলবার উপস্থাপিত ভাষণে করোনার টিকাকে বৈশ্বিক গণপণ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্ব মহামারির এই দুর্যোগে তার এই দাবি যথার্থ। যেসব দেশ করোনার টিকা তৈরি করছে না, তাদের সহায়তা দিতে উৎপাদক দেশগুলোর প্রতি তিনি আহ্বানও জানিয়েছেন। আমরা মনে করি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব ভিন্ন চলমান এই বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলা করা কঠিন।

মন্তব্য করুন