ধান নদী খাল- এই তিনে বরিশাল। আমার বাড়ি এই বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত উলানিয়াতে। বাড়ির পাশ দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে খাল। ১০ মিনিট হাঁটা পথ পার হলেই দৈত্যের মতো বিশাল মেঘনা নদী। কয়েক দিন আগে বাবা ফোন দিয়ে জানালেন, হঠাৎ এলাকার খাল-নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে! এমনটা তিনি আগে কখনও দেখেননি। বিষয়টি তাকে ভাবনায় ফেলেছে।

আমাদের এলাকার মানুষ নদীর মাছ আর নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের কৃষিজমির ওপর নির্ভর। মিষ্টি পানিতে ইলিশ আসে ডিম ছাড়তে। লবণাক্ত হলে নদীতে আর ইলিশ আসবে না! নদীর বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়া পুরো পরিবর্তন হয়ে যাবে। ইলিশ ছাড়াও মিষ্টি পানির অন্য মাছও কমতে থাকবে। জেলেরা তখন বেকার হয়ে যাবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়বে। সামাজিক অস্থিরতায় চুরি, ডাকাতি বাড়বে। অন্যদিকে আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে গেলে আগের মতো ফসল উৎপাদন হবে না। কৃষিকাজে আগ্রহ হারাবে মানুষ। গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হবে।

এত গেল মেহেন্দীগঞ্জের নদী-খাল নিয়ে ভাবনার কথা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ৪২টি নদ-নদীর মধ্যে অনেকই লবণাক্ত হয়ে গেছে। বরিশাল মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) জরিপ বলছে, কীর্তনখোলা, সুগন্ধা, তেঁতুলিয়া, মাসকাটাল, কালাবদর, বলেশ্বর, পায়রা, বিষখালী, আন্ধারমানিক, লোহালিয়া, রামনাবাদ, আগুনমুখা প্রভৃতি নদ-নদীর পানিতেও লবণাক্ততার মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বছর দশেক আগেও এসব নদ-নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা অল্প বাড়ত এপ্রিল থেকে মে-জুনে। এখন এসব নদ-নদীতে লবণাক্ততা অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়ে ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে। আর ভারি বৃষ্টি না হলে লবণাক্ততা কমে না।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে ভয়াবহ বার্তা বলছেন। তাদের মতে, অনেক দিন ধরেই এই অঞ্চলের খরা, অনাবৃষ্টি, ধারাবাহিক অধিক তাপমাত্রা এবং অধিক উচ্চতার জোয়ার ও উপর্যুপরি জলোছ্বাসে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি টের পাওয়া যাচ্ছিল। সাগর থেকে অনেক দূরের নদ-নদীতে এবার লবণাক্ততার অস্তিত্ব পাওয়ার বিষয়টি এরই ধারাবাহিকতা মনে করা হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, এটা খুবই চিন্তার বিষয়। হঠাৎ করে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াটা অ্যালার্মিং। এর স্থায়িত্ব যাচাইয়ের জন্য ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এর কারণ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে নদীর মিষ্টি পানি এখন লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে করে জলজীবন এবং নদীর বাস্তুসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি মাছ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নদীর পানি ব্যবহারকারীরা ভুগতে পারেন নানা অসুখে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুস্ক মৌসুমে উজানের পানিপ্রবাহ কমে আসছে। এখন থেকে ১০ বছর আগে তেঁতুলিয়া নদীতে উজান থেকে পানি আসত দেড় থেকে ২ লাখ কিউসেক মিটার পার সেকেন্ড। এখন সেটা অনেক কমে এসেছে। উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে নদীর পানির উচ্চতা কমে যায়। ফলে সাগরের পানির চাপ বাড়তে থাকে। এতে করে সাগরের পানি নদীতে চলে এলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়, ২০৫০ সালে সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়বে এবং মিষ্টি পানির পরিমাণ কমবে। বাংলাদেশের উপকূলে ৪১ শতাংশ এলাকায় মিষ্টি পানি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ তা কমে ১৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জেলেদের আয় ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কৃষিতে লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে ওই গবেষণায় বলা হয়, যে হারে লবণাক্ততা বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, খুলনা, পটুয়াখালী এবং ভোলা সেচ প্রকল্পের বেশিরভাগ নদীর পানি আর কৃষিতে সেচ দেওয়ার উপযোগী থাকবে না। ফলে এসব এলাকা তার পুরোনো বৈশিষ্ট্য হারাবে।

নদী আমাদের প্রাণ ও সংস্কৃতির অংশ। একই সঙ্গে বরিশাল অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি এসব নদী। গবেষণায় উঠে এসেছে, নদীর কাছাকাছি বিল ও ফসলের ক্ষেতেও লবণাক্ততা হানা দিয়েছে। নদীর এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বিভিন্ন পুকুরের পানিও লবণাক্ত হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বরিশাল বিভাগের আবাদি জমির ৫১ শতাংশ লবণাক্ত! এটা সুখকর কোনো বিষয় নয়। তাই লবণাক্ততা বাড়ার কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

পিএইচডি গবেষক, গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো, রাশিয়া

বিষয় : মিষ্টি নদী লবণাক্ত বারেক কায়সার

মন্তব্য করুন