পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ফলে শুক্রবার হতাহতের যে মর্মন্তুদ চিত্র ফের আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হলো, তা দায়িত্বহীনতার খেসারত বৈ কিছু নয়। এত মানুষ হতাহত হওয়ার ঘটনা বেদনার, শোকের ও ক্ষোভসঞ্চারী। শনিবার সমকালসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, আবাসিক ভবনে অবৈধ রাসায়নিক গুদাম থেকে সৃষ্ট আগুনের কারণেই এই ভয়াবহতা। এই ঘটনা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে পুরান ঢাকার নিমতলী ও চকবাজারের চুড়িহাট্টার সেই বীভৎসতা। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ ও চুড়িহাট্টায় একই কারণে ৭১ জনের দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ট্র্যাজেডির পর থেকেই রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো স্থানান্তরের দাবি উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের দায়িত্বশীল প্রায় সব কর্তৃপক্ষের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। জনাকীর্ণ কিংবা আবাসিক এলাকায় দাহ্য পদার্থ না রাখার ব্যাপারে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা নিমতলী ও চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি থেকে কোনো শিক্ষাই যে গ্রহণ করিনি, আরমানিটোলার দুর্ঘটনা এরই প্রমাণ। আমরা দেখেছি, চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডস্থলে রাসায়নিক, প্লাস্টিক, দাহ্য পদার্থের কারখানা ও গুদাম ছিল। স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়েছে, এসব কারখানা ও গুদাম না থাকলে এত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করতে হতো না। নিমতলী, চকবাজার ও সর্বশেষ আরমানিটোলায় একই চিত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

জনবহুল আবাসিক বাণিজ্যিক এলাকায় দাহ্য পদার্থে গুদাম বা কারখানার কারণে হতাহতের নজির কেবল পুরান ঢাকায়ই নয়, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর মিরপুরে একইভাবে দাহ্য পদার্থবহুল প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লেগে ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, নিমতলী ও চকবাজারে এত ব্যাপক বীভৎস ঘটনার পরও কেন পুরান ঢাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়নি? আমরা জানি, এসব গুদাম বা কারখানা সরকারি অনুমোদন নিয়ে গড়ে ওঠে না। তাই সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর এক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণসহ আনুষঙ্গিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কিনা, তাও যাচাই করার অবকাশ থাকে না। আরমানিটোলা খেলার মাঠ সংলগ্ন হাজি মুসা ম্যানশন নামের যে বহুতল আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এর নিচতলায় ১৮টি রাসায়নিক দোকানের অস্তিত্ব পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। যেন বোমার ওপর বাস করছিল এতগুলো পরিবার! ভবনটির মালিক থাকেন ধানমন্ডিতে। আগুন লাগার পর দিনভর তার কোনো সন্ধান মেলেনি। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর যথারীতি ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা জানি, অতীতের ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন-সুপারিশ হিমাগারে পড়ে আছে। এভাবে আর কত জীবন দায়িত্বহীনতার আগুনে পুড়বে?

আমরা জানি, তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজা ধস থেকে শিক্ষা নিয়ে পোশাক কারখানাগুলোর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেও দাহ্য পদার্থের ব্যবসায়ীদের টনক নড়ছেই না। এক একটি ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ 'শিক্ষা' নেওয়ার-দেওয়ার কথা বলে ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেও ক'দিন যেতে না যেতেই মিইয়ে যায়। এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে উদাসীনতা-অবহেলা-লোভ-লালসার জুয়া চলতে পারে না। আমরা মনে করি, এ রকম অগ্নিকাণ্ড আরও বড় বিপর্যয়ের সতর্ক সংকেত। আমরা দেখতে চাইব, সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ দায়িত্বশীল সব মহলের দায়িত্বশীলরা আর কোনো অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি না ছড়িয়ে দাহ্য পদার্থের গুদাম-দোকান-কারখানা অনতিবিলম্বে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। বাণিজ্যিক, আবাসিক বা শিল্প এলাকার বিভাজন নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবাযনের কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়। দমকল বিভাগকে যত আধুনিক সরঞ্জামেই সজ্জিত করা হোক না কেন, সর্বাগ্রে লোভের আত্মঘাতী আগুন নেভাতে না পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত আগুনের লেলিহান শিখা স্থায়ীভাবে নির্বাপণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজের দায়ের বিষয়টিও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কিন্তু বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই।

মন্তব্য করুন