রহমত, মাগফিরাত আর নাজাত- এই তিন ভাগে বিভক্ত রমজানের দ্বিতীয় ভাগ মাগফিরাতের দিন চলমান। পরম রবের প্রতি আত্মসমর্পিত ও আত্মনিবেদিত বান্দার জন্য সর্বাগ্রগণ্য আরাধ্য ঈপ্সিত বিষয় হলো মাগফিরাত। আর মাগফিরাতের পূর্বশর্ত হলো ইবাদত এবং ইবাদতের সারনির্যাস হিসেবে দোয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মহিমাময় রমজান হলো সেই প্রকৃষ্ট সময়; যখন পবিত্র কোরআন-হাদিস নির্দেশিত পন্থায় পালনকৃত ইবাদতের মাধ্যমে বান্দাগণ মাগফিরাত তথা মহান প্রভুর ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ লাভ করে থাকেন।

আল্লাহপাকের ঘোষণা অনুযায়ী মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দুর্বল প্রজাতির মানুষের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য হলো অপরাধ করা, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া; আর সেটি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়, ছোট কিংবা বড় গুনাহর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। আর মহান স্রষ্টার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো বান্দাকে ক্ষমা করা। তবে এ জন্য বান্দা নিজেকে অনুশোচনায় আচ্ছন্ন করতে হয়, তওবার শর্তাদি পরিপালনের মাধ্যমে পরম রবের কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্বীয় মস্তক অবনত করে দিতে হয়। কৃত অপরাধ বিষয়ে লজ্জিত হওয়া, যাবতীয় পাপাচারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা আর ভবিষ্যতে কখনও পাপাচারে লিপ্ত না হওয়ার দৃপ্ত অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়াই তওবা কবুলের পূর্বশর্ত। এ প্রক্রিয়ায় সম্পন্নকৃত তওবার মাধ্যমে বান্দাকে নিষ্পাপ-নিস্কলুষ ঘোষণা করা হয়; 'আত্তায়িবু মিনায্‌যানবি কামাল্লা যান্‌বা লাহু' অর্থাৎ পাপাচার থেকে তওবাকারী মানুষ এমন হয়ে যায় যে, সে আর কোনো পাপই করেনি। পবিত্র রমজানে রোজাদার বান্দাকে সিয়াম সাধনার এ অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইবাদত ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে মহান আল্লাহর অতীব নিকটবর্তী করে দেয়; যে সুযোগে বান্দা কায়মনোবাক্যে সম্পন্ন ইস্তেগফারের মাধ্যমে পরম সত্তার ক্ষমাপ্রাপ্তির নেয়ামত লাভে ধন্য হতে পারে।

হাদিস শরিফে দোয়াকে ইবাদতের মগজ তথা সারবত্তা বলা হয়েছে। পবিত্র রমজানে ইস্তেগফার লাভে বান্দার জন্য আবশ্যক হচ্ছে দোয়া। দোয়া স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করে। দোয়া এ দুয়ের মাঝে তফাতের অবসান ঘটিয়ে ঘনিষ্ঠতার পরশ বুলিয়ে দেয়; সর্বোপরি মহান রবের সঙ্গে বান্দার প্রেমময় সম্পর্কের শক্ত ভিত গড়ে দেয় এই দোয়া বা মোনাজাত। জগতের মানুষ যত সম্পদশালীই হোক; কোনো কিছু চাইলে রাগ করে, অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু আল্লাহপাক এমন এক সত্তা, যাঁর কাছে বরং কোনো কিছু না চাইলে তিনি রাগ করেন, অসন্তুষ্ট হন। কেননা, তাঁর নামই যে তিনি রেখেছেন ক্ষমাশীল, করুণাময়, দাতা ও দয়ালু। তাই 'ওয়া ইযা সাআল্‌তা ফাসআ লিল্লাহ' অর্থাৎ কোনো কিছু চাইলে আল্লাহর কাছেই চাও- 'ওয়া ইযাস্‌ তাআন্‌তা ফাসতাইন বিল্লাহ'। অর্থাৎ কোনো কিছুর সাহায্যের প্রয়োজন হলে সরাসরি আল্লাহর কাছেই তার নিবেদন কর। পবিত্র রমজান সেই মোক্ষম সময়, যখন আমরা নিবিষ্টচিত্তে মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে, নিজেদের পুরো অস্তিত্ব উজাড় করে দিয়ে, তওবার অঙ্গীকার শানিত করে, যাবতীয় কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে খোদাতায়ালার আস্থাভাজন ও প্রিয়পাত্র হতে পারি। আমরা বলতে পারি, 'আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম'। অর্থাৎ হে মহান আল্লাহ! তোমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাই, নিঃসন্দেহে তুমি তো ক্ষমাশীল ও দয়ালু। 'আল্লাহুম্মা আবুউ বিযানবি ফাগফিরলি ফাইন্নাহু লা য়াগফিরুয্‌যুনুবা ইল্লা আন্‌তা'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আমার কৃত পাপাচার স্বীকার করছি, আমাকে মাফ কর। কেননা, নিঃসন্দেহে তুমি ছাড়া আর কেউ ক্ষমাকারী নেই। 'রাব্বিগ্‌ র্ফি‌লি ওয়াতুব্‌ আলায়্যা ইন্নাকা আন্‌তাত্‌ তাওয়াবুর রাহিম'। অর্থাৎ হে রব! ক্ষমা করে দাও, আমার তওবা কবুল করে নাও; নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী, দয়াশীল।

আমরা জানি, মহান আল্লাহর কাছে চাইলেই তিনি খুশি হন। তাই পবিত্র এ রমজানে আসুন আমরা বলি, 'আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান্‌নার'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাদেরকে জান্নাত নসিব কর আর জাহান্নাম থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই। 'আল্লাহম্মা আজিরনা মিনান্‌নার য়া মুজির'। অর্থাৎ ওহে প্রভু! আমাদেরকে নরকাগ্নির অভিশাপ থেকে মুক্তি দাও। কেননা, তুমিই তো রক্ষাকারী। 'আল্লাহুম্মা আদ্‌খিলনাল্‌ জান্নাতা মাআল আবরার'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমার পুণ্যবান বান্দাদের সঙ্গে আমাদেরও জান্নাতে প্রবেশ করাও। পরিশেষে 'উদউনি আস্তাজিবলাকুম'। অর্থাৎ তোমরা আমায় ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব- মহান আল্লাহর এই বাণীর পরিপ্রেক্ষিতে করোনা-গ্রাসে নাস্তানাবুদ আজকের পরিস্থিতিতে আমাদের বিনীত প্রার্থনা- 'আল্লাহম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন সাইয়িইল আসকাম'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! (করোনাসহ) সর্বপ্রকার ব্যাধি থেকে আমরা তোমার কাছে পরিত্রাণ চাই। 

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন