রাজধানীর পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশনের জন্য ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠা করা হলেও আমরা দেখছি, সংস্থাটি তার মূল কাজ থেকে সরে গেছে। শুধু তাই নয়, রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে, 'সেবা না দিয়ে টাকা নিচ্ছে ওয়াসা'। পয়ঃনিস্কাশনের সেবা রাজধানীবাসী না পেলেও ঠিকই মাসে মাসে সবাইকে বিল গুনতে হচ্ছে। আমরা জানি, নগরবাসীর পয়ঃবর্জ্য শোধন করে তারপর নদীতে অপসারণ করার কথা সংস্থাটির। এ জন্য পাগলায় একমাত্র শোধনাগার থাকলেও রাজধানীর বেশিরভাগ পয়োনালা ভেঙে অকেজো হয়ে পড়েছে। খোদ ওয়াসাই বলছে, ঢাকার ৭৬ শতাংশ এলাকায় পয়োনালা নেই। ফলে পয়োনালার বর্জ্য কোনো না কোনোভাবে নদী, খাল ও জলাশয়ে চলে যাচ্ছে। অথচ ঢাকা ওয়াসা ঠিকই নগরবাসীর কাছ থেকে পয়োনিস্কাশনের বিল আদায় করছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর তা বাড়িয়েও চলেছে! এখানে কেবল নাগরিকের অর্থই যাচ্ছে না, বরং আরও বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি করছে। একদিকে ঢাকার খালগুলোকে বানানো হয়েছে পয়ঃবর্জ্যের ভাগাড়ে।

ঢাকার অধিকাংশ এলাকার পয়ঃবর্জ্য উন্মুক্ত নর্দমা, স্টর্ম স্যুয়ারেজ ড্রেন, বক্স কালভার্ট বা রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে খাল-জলাশয়-নদীতে গিয়ে পড়ার ফলে তা পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে। তার ওপর সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর খালগুলোর দায়িত্ব পেয়ে পয়ঃবর্জ্য খাল-জলাশয়ে ফেলা বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ায় বাড়ির মালিকরা বিপাকে পড়েছেন। এ জন্য প্রত্যেক ভবন মালিককে প্রয়োজনে নিজস্ব সেপটিক ট্যাঙ্ক নির্মাণ করতে হবে। অথচ অনেক ভবনেরই নিজস্ব সেপটিক ট্যাঙ্ক নেই। নতুন করে তৈরির বাড়তি জায়গাও অনেক ভবনে নেই। আমরা মনে করি, সৃষ্ট সমস্যার দায় ঢাকা ওয়াসা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ঢাকা ওয়াসার হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, সংস্থাটি গত অর্থবছরে পয়োনিস্কাশন বাবদ সাড়ে চারশ কোটি টাকা আদায় করেছে। অথচ সমকালের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, কেবল পয়োনিস্কাশনের সংযোগ থাকা ভবনের হিসাব করলে দুইশ কোটি টাকা আয় হওয়ার কথা। সেবা না দিয়েও কেন গ্রাহকের পকেট কাটা হচ্ছে? পানির বিলের সঙ্গে পয়োনিস্কাশন বিল সংযুক্ত করে ওয়াসা যেভাবে টাকা তুলে যাচ্ছে, তা চলতে পারে না।

আমরা জানি, পানি ও পয়োনিস্কাশন বিল নগরীর সকল ভাড়াটিয়াকেই প্রদান করতে হয়। একদিকে বাড়ি ভাড়া অন্যদিকে পানি, পয়োনিস্কাশন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অতিরিক্ত বিল বহন করাই যেখানে অনেক ভাড়াটিয়ার জন্য কষ্টসাধ্য, সেখানে যদি সেবা না পেয়েও গ্রাহককে অর্থ দিতে হয়, সেটি দুঃখজনক। ইতোমধ্যে দুই সিটি করপোরেশন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে, ৩১ মের পর থেকে কোনো পয়ঃবর্জ্য খাল-জলাশয়ে ফেলা যাবে না। এ জন্য প্রত্যেক ভবন মালিককে প্রয়োজনে নিজস্ব সেপটিক ট্যাঙ্ক নির্মাণ করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা এতদিন যেভাবে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য খালে ফেলতে উৎসাহ দিয়ে এসেছে, তাতে অনেকেই সেভাবে ভবন তৈরি করেনি; নতুন সেপটিক ট্যাঙ্ক করতে গেলে ভবন ভেঙে আবার তৈরি করতে হবে। একটি বাসোপযোগী ঢাকা তৈরির কথা বলা হলেও খোদ সেবা সংস্থাগুলোই কীভাবে তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে- এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ঢাকার এই খালগুলোকে মনুষ্যবর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করে অকেজো করাও বর্ষাকালে ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। জলাবদ্ধতা নিরসনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বিগত বছরগুলোতে ঢাকা ওয়াসা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে অনেক জল ঘোলা করে গত বছরের শেষ দিনে খালগুলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আমরা মনে করি, ঢাকা ওয়াসা খালের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও যে সংকট জিইয়ে রেখে গেছে, তার ফল নগরবাসীকে অনেক দিন পর্যন্ত ভোগ করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সেবা না দিয়ে ঢাকা ওয়াসার এভাবে বিল তোলা বন্ধ করে নাগরিক ভোগান্তি কমাতেই হবে। সেই সঙ্গে রাজধানীর একটি টেকসই ও পরিবেশসম্মত পয়োনিস্কাশন ব্যবস্থা গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। নগরবাসীর স্বার্থে ঢাকার খাল উদ্ধারেও নজর দেওয়া চাই।

মন্তব্য করুন