বিগত কয়েক বছরে কয়েকশ মানুষ জীবন্ত আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার পরও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরানো যায়নি। ২৩ এপ্রিল আবারও পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে হতাহতের মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টায় রাজধানীর আরমানিটোলা খেলার মাঠের পাশে একটি ছয়তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আমরা আত্মঘাতী? এতকিছুর পরও সচেতন হই না, রাষ্ট্র সজাগ হয় না। ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হয়, কেমিক্যাল গোডাউন ঢাকা শহর থেকে সরানোর দরকার নেই বরং পুরান শহরের মানুষকে সরিয়ে বনজঙ্গলে নিয়ে যান। ২০১৯ সালে চকবাজারে যা ঘটেছিল ২০১০ সালে নিমতলীতে একই ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিলে হয়তো অঙ্গার হওয়া লাশ আর দেখতে হতো না। নিমতলীর মর্মান্তিক ঘটনার পর কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরনোর দাবি ওঠে। সরকারও নড়েচড়ে বসে। কিন্তু ক'দিন পরই সবাই সব বেমালুম ভুলে যায়। গোডাউন সরেইনি বরং ফুলেফেঁপে গোডাউনের সংখ্যা বেড়েছে। লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে নতুনদের। অবহেলা-উদাসীনতা-দায়িত্বহীনতার আগুনে পুড়ছে মানুষ। যদি জীবনের দাবিই প্রাধান্য পেত তাহলে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর গোডাউন সরানোর প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ বছর সময় লাগত না। ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানোর কথা কেরানীগঞ্জে। কেরানীগঞ্জ বিসিক কেমিক্যাল পল্লির কি খবর? সংবাদমাধ্যম মারফত জানা গেল, ১১ বছরেও মেলেনি জমি! নিমতলী ট্র্যাজেডির পর প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালে কিন্তু অনুমোদন হয় ২০১৮ সালে। আমাদের দুর্ভাগ্য বলতে হয়। ১০ বছরে প্রকল্প অনুমোদন আর বাস্তবায়ন কোনোটাই হয়নি। পুরান ঢাকায় ছড়িয়ে আছে ৪ হাজার কেমিক্যাল গুদাম ও কারখানা। ঘিঞ্জি পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানা ভাবা কি যায়? এমনটি বাংলাদেশেই সম্ভব।

ঢাকাকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করতে সোশ্যাল করপোরেট রেসপনসিবিলিটি যেভাবে গড়ে ওঠার কথা, সেভাবে হয়নি। আর যারা স্টেকহোল্ডার আছেন, তারাও সরকারকে বাধ্য করতে পারেননি। ভবন মালিকদেরও দায় আছে। তারা বেশি ভাড়া পাওয়ার জন্য গোডাউন (রাসায়নিকের জন্য) ভাড়া দেন এবং ব্যাপারটি লুকিয়ে রাখেন। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কি সব উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে? নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ে সরকার চাপের মুখে পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তখন পুরান ঢাকায় ৮০০-এর বেশি অবৈধ রাসায়নিক গুদাম এবং কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি এবং পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এই ব্যবসায়ী এবং তাদের সহায়তাকারী স্থানীয় লোকজনের ভোটব্যাংক রয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কর্তৃপক্ষ কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয় না বলে অনেকেই মনে করেন। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা পরিবেশ অধিদপ্তরও সেভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এসব ব্যবসার লাইসেন্স দেন বা তদারকি করেন, তারাও দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। পুরান ঢাকাকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য রাজউক নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে বকশীবাজার, চাঁদনীঘাট, চকবাজার, মৌলভীবাজার, পুরাতন জেলখানা এলাকা, ইসলামবাগ, রহমতগঞ্জ ও বাবুবাজার এলাকায় তা বাস্তবায়নের চিন্তাও করেন। মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানোর পর ২০১৬ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বংশালের দুটি এলাকাকে রি-ডেভেলপমেন্ট করার সিদ্ধান্ত হয়। শুরু হয় ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময়। অনেকে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের মতামত প্রত্যাশা করে রাজউক। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর রাজউক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরে। মেয়রও এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে তিনি এও বলেন, এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে সভা করে এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরে আরমানিটোলায় পুরান ঢাকার বাসিন্দা, স্থানীয় পাঁচটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও রাজউকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সভা হয়। সভায় কিছু বাসিন্দা রি-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের বিষয়ে রাজউকের ওপর আস্থাহীনতার কথা ব্যক্ত করেন। এতে স্থগিত হয়ে যায় রি-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের কার্যক্রম। এ জন্য দায়টা কিন্তু স্থানীয়দেরও আছে। স্থানীয়দের মধ্যেই অর্থ আর সম্পদের লোভ কাজ করে। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কারণে এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। অথচ রি-ডেভেলপমেন্ট ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে। অবহেলা-উদাসীনতার আগুনে তো এভাবে প্রায় পুড়তে পারে না।

  সমাজকর্মী

বিষয় : মীর আব্দুল আলীম অন্যদৃষ্টি

মন্তব্য করুন