দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় প্রস্তুতি যা ছিল; আক্রান্তের হার এর চেয়ে অনেক বেশি। বরাবরের মতোই বলছি, যদি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে শুধু অক্সিজেন নয়, আরও নানামুখী সংকটে আমাদের পড়তে হবে। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংক্রমণ ঠেকানোর সব পথ অবলম্বন করা।
আমাদের দেশে দৈনিক গড়ে তরল অক্সিজেন উৎপাদিত হয় প্রায় ১৩০ টন। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালে দৈনিক চাহিদা ১৬০ থেকে ১৮০ টন। আমাদের অক্সিজেন আমদানির বড় উৎস ভারতের পরিস্থিতির ক্রমাবনতির কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশটি অক্সিজেন রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি যদি এখানে ঊর্ধ্বমুখী থাকে তাহলে স্বাভাবিক কারণেই বাড়বে অক্সিজেনের চাহিদা। ভারত এখন নিজেদের প্রয়োজনমাফিক অক্সিজেন নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় তাদের রপ্তানি বন্ধ করা ছাড়া কোনো পথ ছিল না। আমাদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের চাহিদা নিরূপণ ও উৎস খুঁজতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, করোনা আক্রান্তের বাইরেও অন্য রোগীর সংখ্যা কম নয়, যাদের অক্সিজেন জরুরি প্রয়োজন। এর মধ্যে করোনা আক্রান্তের বাড়তি চাপ অক্সিজেন সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে প্রকাশিত-প্রচারিত সংবাদ জনমনে কিছুটা শঙ্কারও সৃষ্টি করেছে। যে কোনো দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক কিংবা শঙ্কা নয়; ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই সবার সচেষ্ট হওয়া উচিত। আমাদের এখানে এখনও সেভাবে 'অক্সিজেন সংকট' দেখা দিয়েছে বলে মনে করি না। ভারতে সংকট দেখা দেওয়া এবং তারা রপ্তানি বন্ধ করায় আমরা একটু বাড়তি চাপে পড়েছি।
বর্তমানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কিছু কম; কিন্তু যে কোনো সময় তা বাড়তে পারে। ভারত থেকে আমরা তরল অক্সিজেন আমদানি করি। বাতাস থেকে অক্সিজেন সংরক্ষণ করার পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের এ জন্য বিদেশ থেকে কিছু যন্ত্রপাতি আনা প্রয়োজন হয়তো। আমাদের এখন শুধু তরল অক্সিজেননির্ভর না থেকে বাতাস থেকে অক্সিজেন উৎপাদন ও সংরক্ষণের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এ জন্য যেসব জরুরি উপকরণ দরকার, সেসব বিদেশ থেকে দ্রুত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা অক্সিজেন সংকটে পড়ার আগেই যদি এসব বিষয় নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সহজভাবেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।
অক্সিজেন সংগ্রহ কিংবা মজুদই শেষ কথা নয়। রোগীর শয্যায় যে সরবরাহ লাইন দরকার, তা বসানোর কাজ মধ্যে কিছুদিন বন্ধ ছিল। এ কাজটি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা জরুরি। এর ফলে আইসিইউনির্ভরতা অনেকটা কমবে। একেবারে গুরুতর পর্যায়ে রোগীর অবস্থা না যাওয়া পর্যন্ত এ মাধ্যমেই অক্সিজেন দিয়ে রোগীকে অনেকটা ভালো রাখা সম্ভব। সেন্ট্রাল অক্সিজেন পাইপলাইন সব জায়গায় করা উচিত। এর পাশাপাশি জরুরি হলো আইসোলেশন সেন্টার। আইসোলেশন সেন্টারে যদি আগে থেকেই রোগীকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দানের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হাসপাতালের ওপরে চাপ কমবে। এ ক্ষেত্রে দরকার সিলিন্ডার অক্সিজেন। বিশেষ করে গরিবদের চিকিৎসা দেওয়াটা এর মাধ্যমে অনেকটা সহজ এবং এই শ্রেণিভুক্ত রোগীদের জন্যও তা সাশ্রয়ী ও কল্যাণকর। 'হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ গতবারের চেয়ে অনেক বেড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আইসিইউও বেড়েছে। এগুলো আরও বাড়তে পারত। কিন্তু সংক্রমণের গতি তো বলেকয়ে বাড়ে না। তা ছাড়া আমাদের সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও আমলে রাখতে হবে। এসব ব্যাপারে দক্ষ চিকিৎসক ও তাদের সহায়ক টিম গড়ে তুলতেও কমপক্ষে ছয় মাস সময় লাগে। সেই নিরিখে এ সবকিছু যেটুকু হয়েছে, তা কোনোটাই কম নয়।
দক্ষ জনবলের ঘাটতি ছিল, যা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। নন-কভিড ইউনিট থেকেও অক্সিজেনসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছু নিয়ে আসা হয়েছে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য। নন-কভিড রোগীর সংখ্যাও কম নয়। তাদের চিকিৎসা কার্যক্রমও চালাতে হবে। কিন্তু করোনার কারণে সেসব ক্ষেত্রে অক্সিজেনসহ অন্য বিষয়ে কিছু ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা বাস্তবতার নিরিখে অস্বাভাবিক নয়।

অক্সিজেনসহ করোনা আক্রান্তদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর ঘাটতি বিগত এক বছরেও কমানো যায়নি- এমন ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়। রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেল হঠাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে। এ অবস্থায় প্রস্তুতি যা ছিল, এর চেয়ে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় স্বভাবতই কিছু চাপে পড়তে হয়েছে। রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে প্রস্তুতি যতই নেওয়া হোক, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিনই হবে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না থাকার দায়টা কিন্তু সাধারণ মানুষেরও কম নয়। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা, সচেতন না থাকা ইত্যাদি কারণে আমরা নিয়ন্ত্রণমূলক পরিস্থিতি থেকে হঠাৎ বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়লাম। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ছিল গতবারের অনুপাতে কিংবা তার চেয়ে কিছু বেশি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। এ অবস্থায় অক্সিজেনসহ সবকিছুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়াই তো স্বাভাবিক।
গতবার তিন মাসে রোগীর যে সংখ্যাচিত্র ছিল, তা এবার দেখা গেছে তিন সপ্তাহে। প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েই অনেকে মনে করেছিলেন, সব দায়-দায়িত্ব শেষ। কিন্তু জনস্বাস্থ্যবিদরা এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে বারবার বলে আসছিলেন। এখন অক্সিজেন আমদানি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, সঞ্চালনের ব্যাপারে প্রযুক্তি সহায়তাসহ যা প্রয়োজন, সবই সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে করা উচিত। আমি মনে করি, ভারতের বিদ্যমান সংকটে আমাদের তরফে কিছু অক্সিজেন উপহার হিসেবে পাঠানো উচিত। চীন, কোরিয়া, ইউরোপ থেকে কিছু তরল অক্সিজেন আমাদের আসছে। এসব দেশ থেকে আমদানির পরিমাণটা আরও বাড়ানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি। একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই দুর্যোগ মানবিকতার ক্ষেত্রটা অনেক প্রসারিত করেছে। মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েই এ দুর্যোগে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং দাঁড়াচ্ছেও।
বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে কিছু অক্সিজেন উৎপাদন করে। তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরকার সহযোগিতা করতে পারে। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, মানসম্পন্ন অক্সিজেন যাতে উৎপাদিত হয়। ভারত থেকে স্থলপথে অক্সিজেন আসার কারণে কম সময়ে আমরা তা আনতে পারতাম। খরচও কম পড়ত। সিঙ্গাপুর থেকে নৌপথে অক্সিজেন আনার ব্যাপারে ইতোমধ্যে কেউ কেউ প্রস্তাব রেখেছেন। তাদের যুক্তি, আকাশপথে আনাটা খুব ব্যয়বহুল। এখন প্রয়োজনের নিরিখে ব্যয়বহুল হলেও আমি মনে করি, যে উৎসেই অক্সিজেন মিলবে, সেই উৎসের সঙ্গেই চুক্তিবদ্ধ হয়ে আমাদের চাহিদা অনুপাতে মজুদ বাড়াতে হবে। ভারতে জার্মানির সহায়তায় জেনারেটরের মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপাদন শুরু হয়েছে। আমরাও সে রকম ভাবতে পারি। একটি হাসপাতালে জেনারেটর বসানো হলে অনেক আইসিইউসহ সাধারণ শয্যায় অক্সিজেন সরবরাহ সম্ভব।
আরও একটা বিষয় আমলে রাখতে হবে। যে কোনো সংকট পুঁজি করে আমাদের সমাজে অসাধুরা নিজেদের আখের গোছাতে উঠেপড়ে লাগে। অক্সিজেন সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে এমনটি দেখা গেছে। এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠবেন। যে কোনো দুর্যোগে সংকট দেখা দিতেই পারে। কিন্তু যদি উপযুক্ত প্রস্তুতি থাকে; প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব না হয়, তাহলে সংকট কাটানো কঠিন কিছু নয়।

 রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

মন্তব্য করুন