চীনের স্টেট কাউন্সিলর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেঙ্গির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর কূটনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে কিনা- সে প্রশ্ন উঠছে। আমি মনে করি, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের যে সম্পর্ক, সেটাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ সামান্যই। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বয়স সাড়ে চার দশকেরও বেশি। শুরুতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল সামরিক সহায়তাকেন্দ্রিক। চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে সমরাস্ত্র কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়। এই কারখানা থেকে এখন সমরাস্ত্র তৈরি হচ্ছে। চীন থেকে যেসব সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়, তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও বাংলাদেশে আছে এবং এগুলো কার্যকর। এ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকা থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল। চীনের ক্ষেত্রে তা নয়। এ ক্ষেত্রে সহজে ঋণ সুবিধাও পাওয়া যায়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সমরাস্ত্রই চীনের। তবে ধীরে ধীরে সামরিক খাত ছাপিয়ে চীন বাংলাদেশে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহায়তা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিনিয়োগ। বাংলাদেশের প্রকল্পে ঋণ সহায়তাও করেছে দেশটি।
বস্তুত চীন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। বিভিন্ন দেশে চীন যেমন বিনিয়োগ করছে, তেমনি ঋণ সহায়তা দেওয়াসহ উন্নয়নেও অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশেও উল্লেখযোগ্য মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে চীন।
তার পরও এটা বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ এখন ভারতের প্রতি বেশি 'সফট'। দুই দেশের সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা দেখেছি, সামরিক সরঞ্জাম কিনতে ২০১৭ সালে ভারতের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে। সড়ক, রেলপথ, নৌপরিবহন ও বন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কারিগরিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত থেকে বাংলাদেশের ঋণও পাওয়ার কথা রয়েছে। তার পরও হিসাব করলে চীনের পাল্লাই ভারী হবে। চীনের বিনিয়োগ ক্ষমতা, ক্রয়ক্ষমতা, বাণিজ্যিক লেনদেন প্রভৃতি ক্যাপাসিটি ভারত থেকে অনেক বেশি।
কেবল বাংলাদেশেই নয়; চীন অনেক দেশেই বিনিয়োগ করছে। চীন ও ইরান ২৫ বছরের 'কৌশলগত সহযোগিতা' চুক্তি করেছে। এই চুক্তিতে ইরানের তেল-গ্যাস, ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর উন্নয়ন, রেলওয়ে উন্নয়ন এবং আরও কয়েক ডজন গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীন আগামী ২৫ বছরে কমপক্ষে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে ২৭টি প্রকল্পের ২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার আলোচনা হয়। ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে।
এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। বৈশ্বিকভাবে চীনের প্রধান প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে ভারত। এশিয়ায় বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারত আবার প্রধান প্রতিপক্ষ। আমাদের সঙ্গে ভারতের যে সীমান্ত সমস্যা, সেটা জিইয়ে রাখা হয়েছে। লক্ষ্য রাখতে হবে, চীনের স্টেট কাউন্সিলর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ সফরের আগে ভারতের সেনাপ্রধান সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমাদের সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। আসলে এ সফরটি বলা চলে 'পাওয়ার ব্যালেন্সিং'-এর অংশ।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেঙ্গির সাক্ষাৎ


এবার করোনার টিকার কথায় আসি। চীন গত বছরের শেষদিকে বাংলাদেশকে টিকা দিতে চেয়েছিল। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে বাংলাদেশ একটি কোম্পানির চাপে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করে। ইতোমধ্যে দেড় কোটি ডোজের মূল্য বাংলাদেশ সরকার পরিশোধও করেছে। কথা ছিল, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ হারে ছয় মাসে এ টিকা দেওয়া হবে। সে লক্ষ্যে ৫০ লাখ ডোজের প্রথম চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। এর পর ২০ লাখ ডোজের দ্বিতীয় চালান আসে ফেব্রুয়ারিতে। দ্বিতীয় চালানের বাকি অংশ মার্চের প্রথম সপ্তাহে পৌঁছার কথা থাকলেও প্রতিশ্রুত টিকা আসেনি। এখন ভারতে করোনার যে বিস্তার আমরা দেখছি এবং একই সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের প্রত্যাশিত উৎপাদনও করতে পারেনি। অবশেষে ভারত সরকার টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ মানুষ। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন। দ্বিতীয় ডোজের টিকা দিতেই অন্তত ১২ লাখ ঘাটতি রয়েছে।

এ অবস্থায় সরকারকে টিকার জন্য অন্য উৎস খুঁজতেই হবে। তাই করোনাভাইরাসের টিকার মজুদ গড়তে চীনের সঙ্গে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশীয় উদ্যোগ হলেও এখানে ভারত নেই। 'ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ফর কভিড ফর সাউথ এশিয়া' প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে চীনের উদ্যোগে। বাংলাদেশ ও চীন ছাড়াও রয়েছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। সরকার টিকার জন্য ইতোমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গেও চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে চীনের টিকা পেতেও জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আসলে এর বিকল্পও নেই। সরকারকে জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু সরকার যে টিকা কার্যক্রমে হোঁচট খেলো- এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এখনও বিপুল অধিকাংশ মানুষ টিকার বাইরে রয়ে গেছে, অথচ কেবল একটি দেশের ওপর নির্ভর করে বসে ছিল! এ রকম পরিস্থিতিতে কে আপনাকে শতভাগ টিকা দেবে? যা হোক, চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চীন আমাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু মাঝে টিকা কার্যক্রমে যে গ্যাপ তৈরি হলো, দ্বিতীয় ডোজ টিকায় যে অনেকের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো, এর দায় কে নেবে?

মনে রাখা দরকার, চীনের কাছে এ অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জায়গা থেকেই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা স্পষ্ট। কৌশলগত পারস্পরিক বিশ্বাস জোরদার করা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ তথা বিআরআইর অধীনে দেশে চীনা সহযোগিতা বাড়ছে। এদিকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। স্বাভাবিকভাবেই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (ভারত মহাসাগরীয় কৌশল-আইপিএস) নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। তবে বাংলাদেশের কৌশলী হতে হবে। যদিও বিআরআইর মূল বিবেচ্য হচ্ছে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি। অন্যদিকে আইপিএসের লক্ষ্য নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা। যখনই নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার বিষয় আসবে, তখনই বাংলাদেশকে সেভাবে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

মন্তব্য করুন