পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল। পরে ধাতু পদার্থের ব্যবহারে তা উৎকর্ষ লাভ করে। যুগের নাম হয় পুরাতন পাথরের যুগ, তাম্র ও স্বর্ণ যুগ। কিন্তু লোহা ও ইস্পাতের ব্যবহার এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়েই মূলত সভ্যতার বিকাশ ঘটে। একটা দেশ কতটা উন্নত, তা যেমন জিডিপি বা জিএনপির ওপর নির্ভর করে, তেমনই সে দেশে কী পরিমাণ লোহার ব্যবহার হয়, সেটাও উন্নতির সূচক হিসেবে দেখা হয়।

এক সময় ইউরোপের কিছু দেশ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে নতুন নতুন দ্বীপ ও দেশ আবিস্কারের নেশায় মেতে উঠেছিল, তারা বাণিজ্য স্থাপন করে নানা উপনিবেশও গড়ে তুলেছিল। আমাদের এই উপমহাদেশও ব্রিটিশরা ২০০ বছর শাসন করে। মূলত লোহার তৈরি জাহাজ নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছিল। সঙ্গে লোহার তৈরি কামান, বন্দুক তো ছিলই।

অর্থনীতির দিক থেকে পৃথিবীর তৃতীয় শক্তিশালী দেশ জাপানে লোহাকে বলা হয়, দ্য ফেব্রিক অব আওয়ার ডেইলি লাইফ। জাপানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি লোহার ব্যবহার হয়। শুধু জাপানে নয়, উন্নত সব দেশেই দেখা যায় ইস্পাত ও লোহার ব্যবহার। অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমেরিকা অনেক সময় বিদেশ থেকে লোহা আমদানি না করে নিজের দেশের লোহা ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দেয়। তেল ও গ্যাসের দাম কমে যাওয়ায় রাশিয়া ইস্পাত ও লোহার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সেই বাঁশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। খবরে আমরা দেখেছি, কোনো কোনো সরকারি সেতু বানাতে, এমনকি রেললাইন মেরামতের কাজেও লোহার পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার হয়েছে। এ জন্য শুধু দুর্নীতি বা মানুষের মনোবৃত্তিকেই দায়ী করা যায় না। লোহার ব্যবহার না জানা, সরবরাহ না থাকা ও দাম আয়ত্তের মধ্যে না থাকাই এর প্রধান কারণ। আমাদের দেশে গ্রামের লোকজন বরাবরই বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ঘরের খুঁটি দেয়। এসব খুঁটি ১০-২০ বছর যেতে না যেতেই পচে যায়। গ্রামে এখন অনেকেই খুঁটির নিচের অংশে লোহার অ্যাঙ্গেল লাগায়। তা সহজে পচে না। কিন্তু গ্রামের লোহার অ্যাঙ্গেল কেনার সামর্থ্য যে সবার আছে, তা বলা যায় না।

বাংলাদেশে যেভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখছি, তাতে লোহার ব্রিজই বেশি কার্যকর। আমাদের দেশে কুমার, চন্দনা, বারাসিয়া নদীর মতো সব নদীতেই এখন একটার পর একটা ব্রিজ হচ্ছে। যেখানে খুব প্রয়োজন সেখানে না হলেও অন্য জায়গায় ব্রিজ হয়। কংক্রিটের এসব ব্রিজ কতদিন টিকবে সে চিন্তা নয়, বরং চওড়া এত কম যে, দুটো ভ্যান গাড়ি পাশাপাশি অতিক্রম করতে পারে না। ভেঙে পড়া কংক্রিট কোনো কাজে লাগে না। নদীর তলদেশে পড়ে থাকায় নাব্য নষ্ট করে। ব্রিজগুলো যদি কংক্রিটের না হয়ে লোহার হয়, তখন আর পুরোটাই জলে যায় না। বরং যেভাবে লোহার দাম বাড়ছে, তাতে কর্তৃপক্ষ লাভবান হবে।

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্প ও পরিবেশ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। পরিবেশ সম্পর্কে সবার সচেতন হওয়া দরকার। কিন্তু দেশের এই উন্নতির ও অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লোহা সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম পুরোনো জাহাজভাঙা শিল্পকে বন্ধ করা নয়, বরং উৎসাহ দেওয়া ও রিসাইক্লিং শিল্প আরও জোরদার করা দরকার। যেহেতু সোনা, রুপা, তামা, কাঁসা, পিতলের মতোই লোহাও এক প্রকার ধাতু পদার্থ। এসব পদার্থ খোলা যায়, ভাঙা যায় এবং গলিয়ে প্রয়োজন মতো অন্যকিছু নির্মাণ করা যায়। স্বর্ণের অলঙ্কার ব্যবহারে মানুষের আভিজাত্য প্রকাশ ও দেহের শ্রীবৃদ্ধি করে। লোহা মানুষের দেহ নয়, দেশের আভিজাত্য প্রকাশ করে, দেশকে শক্ত করে। বাংলাদেশে লোহার দাম অত্যধিক বেশি হওয়ায় সাধারণ জনগণ সমস্যায় থাকাতো বটেই, দেশের সার্বিক উন্নয়নে এর প্রভাব পড়ছে। উন্নয়ন হয়, কিন্তু টেকসই হয় না।

টোকিও, জাপান
hm.motahar@yahoo.com

মন্তব্য করুন