২০১৪ সালের কথা, আমি ঢাকার জেলা প্রশাসক। আমার টিঅ্যান্ডটি ফোনে একটি ফোনকল পেলাম। টেলিফোনের অপর প্রাপ্ত থেকে যে ভদ্রলোক কথা বলছেন, তিনি নিজেকে একজন প্রাক্তন সচিব পরিচয় দিয়ে বললেন,

-আমি একজন প্রাক্তন সচিব, মোহাম্মদপুরে থাকি।

আমি বলি,

-বলুন স্যার, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?

তিনি বললেন,

-আমার ছেলেমেয়েরা সকলে ইউরোপ-আমেরিকা থাকে। আমার স্ত্রী বিগত হয়েছেন অনেক দিন আগে। আমি আপনার সহযোগিতা চাই।

আমি বলি,

-বলুন, আমি কী করতে পারি?

তিনি বললেন,

-আমি বাসায় একা থাকি। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার কেউ নেই। আপনি যদি একজন কর্মকর্তা পাঠান, তবে সে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দিতে পারে।

আমি তাৎক্ষণিক একজন সহকারী কমিশনারকে প্রাক্তন সচিবের বাসায় প্রেরণ করি। পরের দিন ওই কর্মকর্তা অফিসে এলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ঘটনাটি কী? আমার কর্মকর্তা আমাকে বললেন, ভদ্রলোকের বয়স প্রায় নব্বই-ঊর্ধ্ব। একসময় সচিব ছিলেন। সব ছেলেমেয়ে দেশের বাইরে থাকে। মোহাম্মদপুরে তার বাসায় একমাত্র গৃহকর্মী ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি বয়সের ভারে এত ন্যুব্জ যে, হাঁটতে পারেন না।

তিনি আরও কয়েক মাস আমাকে টেলিফোন করে টাকা তুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং আমি কর্মকর্তা পাঠিয়ে সে কাজটি করে দিই। দু-একবার বাজারও করে দিতে হয়েছে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চার শ্রেণির লোক সাধারণত আমরা পাই- নিঃস্ব, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। পরের তিনটি শ্রেণির মধ্যে শ্রেণি পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা প্রবল। নিম্নবিক্ত মধ্যবিত্ত হতে চায় আবার মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত হতে চায়। সমাজে এ ভাঙাগড়ার খেলা চলে নিরন্তর। গ্রামের মধ্যবিত্ত ঘরের একটি ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে সে সময় সে 'দাতন ছেড়ে টুথব্রাশ', 'গামছা ছেড়ে তোয়ালে' লুঙ্গি ছেড়ে স্লিপিং স্যুট'-এর ব্যবহার শেখে। মনোজগতেও অনেক পরিবর্তন হয়। প্রকৃতপক্ষে, সে শ্রেণিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের উচ্চবিত্তের এ কাতারে পৌঁছানোর চেষ্টা অবিরাম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা শুধু পড়ালেখা করে না, উচ্চবিত্ত হওয়ার কাতারে কীভাবে শামিল হতে হয়, সে প্রশিক্ষণও তারা সেখান থেকে পেয়ে থাকে।

যদি মোহাম্মদপুরের ওই সচিবের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করি, তবে দেখব, তিনি হয়তো গ্রামের এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর গ্রাম থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। হলে থেকে পড়াশোনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে হলই ছিল তার প্রশিক্ষণ স্থান। ওখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। পড়ালেখা শেষে তিনি সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন। বিয়ে করেছেন কোনো এক শহরের নামিদামি ব্যক্তির কন্যাকে। এরপর কাজের চাপে ছেলেমেয়েদেরও তিনি গ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেননি। পড়ালেখা শিখে তারা প্রবাসী হয়েছে। এখন ঢাকায় তিনি শুধু একা। তাকে দেখার কেউ নেই।

একজন ব্যক্তি যখন শ্রেণি পরিবর্তন করেন, তখন তিনি নিজের শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন না, হয়ে ওঠেন উচ্চবিত্ত। ব্যতিক্রম ছাড়া উচ্চবিত্তের কাতারে শামিল কর্মকর্তাদের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে না। যোগাযোগের অভাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজন সবাই পর হয়ে যায়। পদ যত বাড়তে থাকে গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগও তত কমতে থাকে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে যখন তিনি পৌঁছান তখন আর তার শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ থাকে না। এরই মধ্যে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যায়। দায়িত্ব পালনের চাপে গ্রাম বা জন্মস্থানের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা আর মনে হয় না। সন্তানদের গ্রামের নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় না। এরপর একসময় ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা বা বৈবাহিক কারণে দেশের বাইরে চলে যায়। অবসরে পিতা-মাতাকে দেখার জন্য আর কেউ থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু-একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অবসরে ছেলেমেয়ের কাছে বিদেশে গিয়ে থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা আবার ফিরে এসেছেন। কারণ সেখানে তার সঙ্গে কথা বলার বা সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ নেই। সে জীবন তো আরও নিঃসঙ্গ।

সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স ৫৯ বছর। আমাদের গড় আয়ু এখন ৭২.৪৩ বছর। অবসরের সময়টি এত দীর্ঘ যে, একাকিত্ব শেষ হয় না। তাছাড়া শেষ বয়সে মানুষ শিশুদের মতো অবলম্বন চায়। ঠিক সে সময় তারা হয়ে ওঠেন অবলম্বনহীন। বিভিন্ন প্রকার রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। কী দুর্বিষহ অবসর জীবন?

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করার সংস্কৃতি সবে শুরু হয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছু কিছু বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় এসব বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা অতি নগণ্য। তাহলে স্বজনহীন এসব বৃদ্ধরা কোথায় যাবেন? সরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে- যা বাজেটের প্রায় ১৬.৮৩%। একসময় যারা দেশের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন, তাদের দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নিতে পারে না?

আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম সামাজিক সুরক্ষা খাতে জোর দিয়েছে। এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। অন্তত ৮৪টি সামাজিক সুরক্ষা খাত সরকারি বরাদ্দ পাচ্ছে। এ সরকার অটিজমে আক্রান্ত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছেলেমেয়েরা যাতে তাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ করে, সেজন্য 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ (২০১৩ সালের ৪৯ নং আইন)' নামে একটি আইন প্রণয়ন করেছেন। এ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে আমার মনে হয়, কোনো ছেলেমেয়ে তার পিতামাতাকে বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা না করলে তারা পিতা-মাতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন, এ রকম একটি ধারা এ আইনে যুক্ত করা আবশ্যক।

প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে আমি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম। আমাদের কোর্স পরিচালক মি. রয় কেলি একদিন আমাদেরকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান। আমরা সেখানে যাই। তার বাড়ির পাশে লেকের পাড়ে একটি সুন্দর বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। সেটি দেখার জন্য আমরা সেখানে যাই। কি অপূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে এ বৃদ্ধাশ্রমটি নির্মাণ করা হয়েছে। লেকের পাড়ে প্রতিটি বাংলো টাইপ ঘরে ৫/৬ জন 'সিনিয়র সিটিজেন' বসবাস করেন। এ রকম অনেকগুলো ঘর নিয়ে গাছ-গাছালির ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে বৃদ্ধাশ্রমটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ক্লাস্টার হাউস বা গুচ্ছ গ্রাম। একটি ছোট্ট ক্লিনিক রয়েছে, যেখানে স্বল্প পরিসরে সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করে থাকে। কনজারভেনসি সার্ভিস ও রান্নার কাজে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন সহায়তা দিয়ে থাকে। সুপরিসর এসব বাড়িতে ইন্টারনেট সুবিধাসহ সব সুবিধা রয়েছে। ডাইনিং, বাথরুম, লিভিং রুম, টেবিল টেনিস খেলার মতো স্পেসসহ সেখানে সব সুবিধা বিদ্যমান। সামনে রয়েছে অপূর্ব লেক। লেকে বিভিন্ন প্রকার পাখির কলকাকলিতে নৈস্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি লক্ষণীয় সেটি হলো, বিভিন্ন স্কুল থেকে শিশু-কিশোরদেরকে এক সপ্তাহ বা তার বেশি কিছু সময়ে সেখানে অতিথি হিসেবে আনা হয়। তারা 'সিনিয়র সিটিজেন'দের সঙ্গে কয়েকদিন বসবাস করে। এতে 'সিনিয়র সিটিজেন'দের প্রতি ভবিষ্যতের নাগরিকদের একদিকে যেমন শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে 'সিনিয়র সিটিজেন'রা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্বজনের অনুপস্থিতির বিরহ-বেদনা ভুলে থাকতে পারেন।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত জনবহুল একটি দেশ। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের পরিকল্পনা করে বৃদ্ধাশ্রম বানানো না গেলেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ক্ষুদ্র পরিসরে উন্নত মানের বৃদ্ধাশ্রম আমরা তৈরি করতে পারি। এখানে যারা বসবাস করবেন, তারা নিজেরা তাদের থাকা ও খাওয়ার ভার বহন করবেন। রাষ্ট্র শুধু অবকাঠামো তৈরি ও প্রশিক্ষিত লোকবল দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনায় সহায়তা করতে পারে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এ রকম বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করতে চান। রাষ্ট্র তাদের সহযোগিতা করলে এই প্রয়াস সার্থক হবে। আশা করি রাষ্ট্রের সংশ্নিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

মন্তব্য করুন