উত্তর প্রদেশ রাজ্যের নির্বাচনের সময় ২০১৭ সালে প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরেকটি দুঃখজনক ঘটনার জন্ম দেন। জনতুষ্টির জন্য তিনি বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকা রাজ্যটির সরকারকে মুসলমানদের জন্য তাদের কবরস্থানের সম্প্রসারণের সমালোচনা করে বলেন, রাজ্য মুসলমানদের পক্ষে কাজ করে, হিন্দুদের শ্মশানের চেয়ে মুসলমানদের কবরস্থানে অধিক ব্যয় করে। তার এই অবজ্ঞার অভিযোগ তখন ব্যাপকভাবে জনসমর্থন পায়। সমবেত জনতাকে তিনি বলেন, একটি গ্রামে যদি কবরস্থান নির্মাণ হয়, সেখানে শ্মশানও তৈরি করতে হবে।

তখন সমবেত জনতা 'শ্মশান শ্মশান' বলে চিৎকার করে, আর তা প্রতিশব্দ করে ফিরে আসে।

সম্ভবত এখন তিনি আনন্দিত হবেন। কারণ এখন ভারতের চিতাদাহের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশ হয়। সেখানে প্রতিদিন মৃতদেহ দাহ করতে শ্মশানের কর্মীদের দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। দাহ করতে প্রবল চাপ নেওয়া শ্মশান কর্মীদের সঙ্গে এখন হাত লাগাতে হচ্ছে মৃতের স্বজনদেরও। নতুন শ্মশান নির্মাণ করতে কর্তৃপক্ষ এখন পার্কিং লট, মাঠ বা পার্কের দিকে নজর দিয়েছে। শ্মশানে নতুন চিতা নির্মাণ করা হয়েছে। তার দেশের সব কবরস্থান ও শ্মশান এখন ভালোভাবেই কাজ করছে। বরং মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেখানে আরও বেশি চিতা প্রয়োজন।

ওয়াশিংটন পোস্ট তার এক সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে ভারতের এই বিপর্যয় এবং সেখানে করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে আলঙ্কারিকভাবে প্রশ্ন তুলেছে, 'ভারতের একশ ত্রিশ কোটি মানুষকে কি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব?' পত্রিকাটিই তার জবাব দিয়েছে, এত সহজ নয়। করোনাভাইরাস যখন কয়েক মাস আগে ইউকে এবং ইউরোপেও এমন রূপ ধার করছিল, তখনও এমন প্রশ্ন উঠেছিল। তবে ভারতের এ প্রশ্ন খণ্ডায়নের অধিকার রয়েছে সামান্যই। কারণ এ বছরের জানুয়ারিতে নরেন্দ্র মোদি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তৃতা দিয়েছেন। মোদি এমন সময়ে বক্তৃতা দিয়েছেন যখন ইউরোপ ও আমেরিকা অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করে। তিনি তাদের প্রতি কোনো ধরনের সহমর্মিতামূলক কথা বলেননি। বরং সেখানে ছিল ভারতের করোনা পরিকল্পনার গর্ব আর আতিশয্যের ফুলঝুরি। আমি বক্তৃতাটি ডাউনলোড করে রেখেছি, কারণ আমার ভয় হলো, মোদি শাসনের ইতিহাস আবার অন্যভাবে লেখা হয় কিনা। বক্তৃতাটি যদি গায়েব হয়ে যায় কিংবা পেতে অসুবিধা হয়। তার বক্তৃতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরছি :'বন্ধুগণ, এই উৎকণ্ঠার সময়ে আমি একশ ত্রিশ কোটি ভারতীয়র পক্ষ থেকে আত্মবিশ্বাস, ইতিবাচকতা ও প্রত্যাশার বার্তা নিয়ে এসেছি।... ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, ভারত হবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত দেশ। বলা হয়েছিল, ভারতে করোনা সংক্রমণের সুনামি হবে। কেউ বলেছে, ৭০-৮০ কোটি ভারতীয় আক্রান্ত হবে, যেখানে বিশ লাখ মারা যাবে।'

'বন্ধুগণ, ভারতের সফলতাকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করে বিচার না করার পরামর্শ আমার। ভারতে বিশ্বের ১৮ শতাংশ জনসংখ্যার বাস। দেশটি করোনাকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানবতা রক্ষা করেছে।'

জাদুকর নরেন্দ্র মোদি করোনা নিয়ন্ত্রণ করে মানবতা রক্ষার জন্য অভিবাদন গ্রহণ করেন। কিন্তু বিপরীতে এখন আমরা যা দেখছি, তার জন্য কী অভিযোগ করতে পারি? এখন কেন অন্য দেশগুলো আমাদের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করছে এবং বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করছে? এটা এ কারণেই যে, আমরা আমাদের ভাইরাস এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে অসহায়। সকল প্রকার অসুস্থ, অবৈজ্ঞানিক, ঘৃণা এবং অজ্ঞানতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন। তিনি যে চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেন, তার রাজনৈতিক দলও তারই চেতনার।

ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকার কর্মী; গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

মন্তব্য করুন