নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশে এ পর্যন্ত নানামাত্রিক আন্দোলন কম হয়নি। প্রায় এক দশক ঝুলে থাকার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত এ আইন কার্যকর হওয়ার বিষয়কে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরিবহন নেতাদের 'চাপে' বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইনটি শিথিল করতে যাচ্ছে সরকার। শনিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনটি সংশোধন করে জেল-জরিমানা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এ আইনের ৩৪টি ধারা শিথিল করতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সমকালের প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এ আইনের ১২৬টি ধারার ২৯টিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জরিমানা পাঁচ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ করা এবং এ অপরাধের মামলা জামিনযোগ্য করার উদ্যোগ জনস্বার্থবিরোধী বলে আমরা মনে করি।

দুই বছর ধরে আলোচনার পর এ আইনের এতটি ধারার যে স্পর্শকাতর পরিবর্তন আনার খসড়া তৈরি করা হয়েছে, তাতে দীর্ঘদিনের নিরাপদ সড়কের দাবি কানাগলিতে হারিয়ে যেতে থাকবে। সংশোধনের খসড়ার ওপর সব অংশীজন ও জনসাধারণের মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্ব থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পর্ব পর্যন্ত জনস্বার্থের বিষয়টি আমলে রেখে আইন শিথিলের প্রস্তাব নাকচ করাই হবে শ্রেয়। আমরা জানি, বিধি অনুযায়ী খসড়া আইনটি যদি মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাভ করে, তাহলে তা সংসদে উপস্থাপিত হবে এবং সংসদে পাস হলে সংশোধন কার্যকর হবে। এমন প্রক্রিয়া যখন চলমান, তখনও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের মর্মন্তুদ চিত্র এমন উদ্যোগের বিপরীতে প্রশ্ন দাঁড় করায়।

রোববার সমকাল অনলাইনে প্রকাশ, সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুরে ট্রাকচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ছয় যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। 'কঠোর' আইন বলবৎ থাকা অবস্থায়ই যেখানে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে আইন শিথিল করলে অবস্থা কী হবে- তা সহজেই অনুমেয়। এ যেন নাচুনে বুড়িকে ঢোলের বাড়ি শোনানো। সড়কে যে নৈরাজ্য চলছে; এ অবস্থায় সড়ক পরিবহন আইন শিথিল করা হবে আত্মঘাতী। সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়। গুরুতর এ সমস্যা সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব যে পায় না- সড়ক পরিবহন আইন শিথিল করার উদ্যোগ এরই সাক্ষ্য দেয়। সিলেটের জৈন্তাপুরে ফের যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, তা দেখে যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। এমন প্রেক্ষাপটে পুনর্বার আমাদের সামনে এ প্রশ্নই উঠে এসেছে- সড়ক আর কতদিন মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকবে? এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে?

আমরা জানি, জাতিসংঘের অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশও অঙ্গীকার করেছিল- ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কাজ করবে। বস্তুত তা তো হয়ইনি, বরং দুর্ঘটনার হার আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ-প্রচেষ্টা ওই অঙ্গীকারের যেন বিপরীত। অনেক উন্নত দেশেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর হার যেমন আমাদের দেশের মতো এত বেশি নয়, তেমনি নয় এমন প্রতিকারহীনও। আমাদের দেশে যে হারে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, তা জাতীয় দুর্যোগ বললেও অত্যুক্তি হয় না। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক, বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধসহ আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতে সরকারের উদ্যোগ তো পর্যাপ্ত নয়ই; এর মধ্যে এখন আইনের ধারা শিথিল করার উদ্যোগ আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা আশা করি, সরকার নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোনোরকম ছাড় দেবে না।

মন্তব্য করুন