আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি এখন আর শুধু লাভ-লোকসানের টাকার অঙ্কের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে এখন গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমরকৌশল ও নানা জোটগত কলাকৌশলের হিসাব-নিকাশও। বাংলাদেশ গত ১৯ জুলাই চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক বায়োটেককে করোনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নীতিগত অনুমোদন দিয়েও পরে আবার তা থেকে পিছিয়ে আসে। ধারণা করা হয় যে, ভারতের জোর কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত পাল্টে সিনোভ্যাকের পরিবর্তে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষে টিকা আমদানিকারী বেসরকারি কোম্পানিটির আগ্রহও বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। তবে কারণ যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এই যে, বাংলাদেশকে আবার চীন ও অন্যদের কাছেই ফিরে যেতে হলো।

বাংলাদেশকে টিকা সরবরাহের লক্ষ্যে সিনোভ্যাক বায়োটেক গত জুলাইতে টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি চেয়েছিল, যে বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়াও হয়েছিল। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, তারা এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এড়িয়ে এর পরিবর্তে 'জরুরি ব্যবহারের' অনুমতি চাচ্ছে। ধারণা করা যায়, টিকা নিয়ে যে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে এখন সময়ের চাপ সামলাতে তাদের হয়তো জরুরি ব্যবহারের সে অনুমতিই দেওয়া হবে, যেমনটি ইতোমধ্যে রাশিয়াকে স্টম্ফুটনিক ভি-এর জন্য দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, রাশিয়া কিন্তু এই টিকা বাংলাদেশকে দিতে গত সেপ্টেম্বরেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তখন বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি। আশঙ্কা হচ্ছে, তখন বিচক্ষণতার অভাব ও ধীরগতির কারণে সিদ্ধান্ত নিতে যেমন ভুল হয়েছে, এখন না আবার অতিতাড়াহুড়া করতে গিয়ে চুক্তির ভেতরকার শর্ত ও পালনীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে নতুন কোনো ভুল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে একটিই পর্যবেক্ষণ, টিকা সংক্রান্ত বিষয়ে যে কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এর প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন পর্যাপ্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, যাতে পরে তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে না চোখে পড়ে যে, সেখানে দেশের স্বার্থ লঙ্ঘিত হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে টিকা বাংলাদেশের অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেটি যেন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে না হয়। বিশ্বরাজনীতিতে, বিশেষত এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এখন আর কোনো গুরুত্বহীন দেশ নয় এবং যে কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে দরকষাকষির সামর্থ্য বাংলাদেশের যথেষ্টই রয়েছে। অতএব পর্যাপ্ত কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে সে সামর্থ্য ও সুযোগটির পূর্ণাঙ্গ সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট হতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকার প্রথম ডোজ যারা নিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের জন্য দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করা, যা এখন সংগ্রহ-ঘাটতির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গণমাধ্যমের খবর থেকে যতটুকু জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া থেকে তা সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বেপিমকোর চুক্তিতে যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ যেন আর কোনোভাবেই ভারতের দিকে চেয়ে থেকে সময় নষ্ট না করে। চুক্তিভঙ্গের দায়ে সিরামের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, সেটি বেপিমকো পরবর্তী সময়ে আলাদাভাবে চিন্তা করতে পারে। আর অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ টিকা সংগ্রহ করতে গিয়ে এর সঙ্গে অন্য টিকা বা বিষয় যেন যুক্ত হয়ে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে টিকা সংগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি (যদি হয়) আলাদাভাবে ধীরস্থিরভাবে যাচাই-বাছাই করে করাটাই শ্রেয়তর। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আপাতত শুধু অ্যাস্ট্রেজেনেকার দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি-পরিমাণ টিকাই জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহ করা যেতে পারে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পর অন্যান্য টিকা সংগ্রহের বিষয়ে আলাদা চুক্তি হতে পারে।

আর চীন থেকে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে চুক্তিতে না হলেও কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা ইস্যুকে দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ এটি এখন স্পষ্ট যে, চীনের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপে ফলার এর চেয়ে উত্তম কোনো উপায় নেই। আর এটি তো দেখাই গেল যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি। তা কেউই যখন দাঁড়ায়নি, তখন এই অ-দাঁড়ানোদের মধ্য থেকে যে বাংলাদেশকে সর্বাধিক সাহায্য করতে পারবে, তার শরণাপন্ন হওয়াটাই অধিকতর সমীচীন বলে মনে করি এবং এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তা চীন। আর চীনের কাছ থেকে টিকা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি যেহেতু আরও প্রায় এক বছর আগে থেকেই চলছে, অতএব তাদের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহটিই এ মুহূর্তে অধিকতর সাশ্রয়ী, কম সময়ক্ষেপী ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে বলে মনে করি। তবে পুনরাবৃত্তি হলেও বলি, এ ক্ষেত্রে চীনকে কূটনৈতিক কৌশলে মূল বার্তাটি দিতে হবে এই যে, টিকা সংগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশ যে কিছুটা হলেও ভারত থেকে চীনের দিকে সরে এসেছে, তার পেছনকার একটি বড় কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের কার্যকর সহযোগিতা প্রত্যাশা।

টিকা সংগ্রহের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় ২৭ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে যে দৃঢ়চেতা বক্তব্য রেখেছেন, তা খুবই যৌক্তিক। এ ধরনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি এ মুহূর্তে জনসমক্ষে তুলে ধরাটা খুবই জরুরি ছিল, যা থেকে আন্তর্জাতিক মহলে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে এবং টিকা নিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনায় তা অনেকখানি সহায়ক হবে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু সংবাদ সম্মেলনের জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না, একে বাস্তব যোগাযোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিনয়ের সঙ্গে একটি কথা বলি : গত প্রায় দেড় বছরের অভিজ্ঞতা বলে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও আমলাতান্ত্রিক যোগ্যতা বা দক্ষতা কোনোভাবেই টিকা উৎপাদন ও আমদানির লক্ষ্যে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর সংক্রান্ত দলিলপত্রের খসড়া প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত ও সামর্থ্যসম্পন্ন নয়। ফলে এ বিষয়ে যে কোনো বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আনুষঙ্গিক দলিলপত্রের খসড়া প্রণয়নের জন্য অবশ্যই যেন কভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি কমিটি ও সংশ্নিষ্ট বিষয়-বিশেজ্ঞদের পরামর্শ ও অন্যবিধ সহায়তা নেওয়া হয়। প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যেতে পারে।

বিষয় : টিকা কূটনীতি

মন্তব্য করুন