খাদ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই সত্যও এড়ানো যাবে না, সুষম খাদ্যে এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি এ দেশ। সুস্থ-সবল জাতি গড়তে হলে মানুষের সুষম খাদ্য গ্রহণ জরুরি। আর এ খাদ্য তালিকায় সবজির যে বিশেষ ভূমিকা আছে, তা কৃষি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন, যা আমরা এখনও আমলে নিতে পারিনি। আমাদের খাদ্য তালিকায় দৈনিক ২০১ গ্রাম সবজি থাকা উচিত। অথচ পাচ্ছি মাত্র ৫০ গ্রাম। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ যেমন- জাপানে মাথাপিছু ২৮৭ গ্রাম, কোরিয়ায় ৫৮৯ গ্রাম এবং চীনে ৩০৬ গ্রাম সবজি গ্রহণ করছে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। ফলে কৃষিজমি ব্যবহূত হচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শিল্প স্থাপনে। আবার একাধিকবার এবং অধিক ফসল ফলানোর কারণে জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ ব্যবহারের ফলে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। জমির নিজস্ব উৎপাদন শক্তি হ্রাস পেয়ে চলেছে এবং মাটির প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হচ্ছে। আমাদের জমিতে খুবই কম জৈব পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে, আবার মাটির অনুখাদ্যের ভান্ডারও কমতির দিকে। মাটির পানি ধারণক্ষমতা হ্রাসের সমস্যাও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে একক চেষ্টা না করে সমষ্টিগতভাবে করা উচিত। আমাদের দেশের সবজি উৎপাদন যেখানে ৫০০ টনের মতো প্রতি হেক্টরে, সেখানে জাপানে ৩১ দশমিক ৭৯ টন, কোরিয়ায় ১৭ দশমিক ২০ টন এবং চীনে ৩৫ দশমিক শূন্য ৩ টন। বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, এ উৎপাদন বাড়ার কারণ হাইব্রিড বীজ ব্যবহার এবং উন্নত চাষ পদ্ধতির প্রয়োগ।
জাপান, কোরিয়া, চীনে দেখা যায় বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো ইত্যাদি প্রায় শতভাগ উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের সবজির আওতায় উৎপাদন হচ্ছে। সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আমাদের উন্নত জাতের হাইব্রিড সবজি এবং উন্নত প্রথায় চাষ করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে, এক জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নতমানের বীজ এবং জমির স্বাস্থ্য বজায় রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করা। আমাদের অনেক কৃষক এখনও জানেন না কোন সবজি মাটি থেকে কী পরিমাণ সঞ্চিত খাদ্য গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন জাতের সবজিতে ভালো উৎপাদন পেতে কী কী সার মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। অবশ্য অনেক কৃষক সবজি চাষে বেশ ভালো ফলন ফলাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- জমির স্বাস্থ্য বজায় রেখে কি সে ফলন হচ্ছে? এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আরও একটি বিষয়ে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। তা হলো কোন সবজির কী পুষ্টিগুণ, তা অনেকেই জানি না। শুধু সবজির চাষ করলে চলবে না; সেই সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন সবজি কোন এলাকায় হবে, তাও ঠিক করে আগাতে হবে। কারণ এ পরিকল্পনার অভাবে কৃষকরা অনেক সময় উপযুক্ত মূল্যে তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারেন না। আমরা প্রায়ই দেখি ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ইত্যাদি একই সময় সব কৃষক বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে উপস্থিত হন। প্রয়োজনের নিরিখে হিমাগার না থাকায় কম দামে তারা উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। প্রয়োজনের নিরিখে যেমন হিমাগার তৈরির বিষয়টি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি, তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে হবে।
কৃষকবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়তে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভরার পথ বন্ধ করতে হবে। সবজি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের অনুকূলে অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছি না। বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদে যেমন কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তেমনি তারা যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সেদিকে নজর বাড়ানো দরকার। আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজির মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন আরও বেশি করে যুক্ত করা সুস্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই খুব প্রয়োজন।
সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী

মন্তব্য করুন