চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম আট মাসে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। প্রথম এই ৮ মাসে পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার, আর রপ্তানি হয়েছে ২১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রকৃত রপ্তানি ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ কম অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকা। সেখানেও আমাদের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম এই ৮ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে করোনার প্রভাব অবশ্যই রয়েছে। তবে তা একমাত্র কারণ নয়। কেননা, আমরা দেখেছি, করোনার ধাক্কা সামলে ইউরোপের বাজার খুললেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। কাজেই আমাদের শিল্পের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে, যদিও তা কিছুটা কঠিন বলে মনে হতে পারে। অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন, শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়তির ফল। কিন্তু অন্যদের মতো আমি তা মনে করি না। বরং আমার মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প উন্নয়নের এমন একটি স্তরে পৌঁছেছে, এ শিল্পকে এ অবস্থা থেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে এবং নতুন নতুন ধারণা কাজে লাগাতে হবে। আগের সেই একই পথ অন্ধের মতো অনুসরণ করলে আমাদের শিল্প তার সক্ষমতার অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে না। পাঁচটি উপায় বা পন্থার উল্লেখ ও আলোচনা করতে চাই, যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদে আগের মতো প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে।
১. পণ্য বহুমুখীকরণ
পোশাক শিল্প এখনও সস্তা ও বেসিক পণ্য রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আমাদের মোট রপ্তানিকৃত পোশাকের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশই হলো এই বেসিক পণ্য। যদি এই পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। কাজেই আমাদের পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। কারণ উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানিকারকদের আয় বৃদ্ধি করবে।
২. কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি
আমাদের পোশাক কারখানাগুলো কি তাদের বিদ্যমান সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে? আমাদের দেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদনশীলতার হার বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম; চায়নার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। উৎপাদনশীলতার হার নিয়ে অনেক তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। তবে এ শিল্পসংশ্নিষ্ট বেশিরভাগের মতে, বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতার হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, যা চায়নার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কম। অর্থাৎ চায়নায় পোশাক প্রস্তুত করতে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা প্রয়োজন, বাংলাদেশে সেই একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে তার প্রায় দ্বিগুণ কর্মঘণ্টা ব্যয় হয়।
কম উৎপাদনশীলতার মানে হলো, বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় প্রতি ইউনিট পণ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত সময় ও মজুরি ব্যয় হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা মুনাফা এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবো।
৩. জ্বালানি সাশ্রয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি
জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ইনভারটার, থার্মাল ওয়েল হিটার, জৈব গ্যাস প্লান্টস, স্কাই লাইট, বয়লার ইকোনমাইজার, সৌরশক্তি ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ী বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বেশ সক্রিয়। কিন্তু জ্বালানি সাশ্রয়ে কারখানাগুলোর দক্ষতা বেগবান করার ক্ষেত্রে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা ও রেগুলেটরি সংস্কারের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় বিজিএমইএর নেতৃত্বে তদারকি ও সমাধান দরকার।
৪. ব্র্যান্ড পরিচিতির পরিবর্তন ও পণ্যের পুনর্ব্যবহার
ছাড়ের পোশাক রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের সমধিক পরিচিতি রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু ক্রমেই এ মডেলের দিন শেষ হয়ে আসছে। কাজেই আমরা কেন অন্য কিছুর জন্য বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠতে পারব না? আমরা কেন চক্রাকার অর্থনীতি বাস্তবায়নের দিক থেকে অগ্রগামী হবো না? বর্তমানে বিশ্ব-পোশাক শিল্পে এমন ক্ষেত্রের সংখ্যা খুবই কম, যেখানে সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু তা নিয়ে বেশি কাজ করা হয়নি। চক্রাকার অর্থনীতি হলো তেমনি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, যা নিয়ে কাজ করার এখনও পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। টেক্সটাইল পণ্য পুনর্ব্যবহারোপযোগী করার জন্য ব্যাপক প্রযুক্তি রয়েছে। তা সত্ত্বেও টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনকারী কোনো দেশই বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেনি। কাজেই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশ চাইলে কাজে লাগাতে পারে। পোশাক পণ্য রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারোপযোগীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হতে পারে একটি উত্তম পরীক্ষার ক্ষেত্র। বাংলাদেশ ও পোশাক খাতসংশ্নিষ্টরা যদি এ বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই লাভজনক হবে। কেননা, এ ক্ষেত্রটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। এ বিষয়ে আমাদের বিচক্ষণতার সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৫. বিশ্বমানের হয়ে ওঠা
একটি প্রবাদ প্রচলিত- আপনি কেবল আপনার সবচেয়ে খারাপ কর্মচারীর মতো ভালো। অর্থাৎ একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য একজন খারাপ কর্মচারীই যথেষ্ট। একইভাবে একটি শিল্পের সুনাম নষ্ট করার জন্য একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই যথেষ্ট। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এ বিষয়টি আরও বেশি প্রযোজ্য। কেননা, পোশাক শিল্পের ব্যাপারে সারাবিশ্বের নজর সব সময় একটু বেশিই থাকে। কোনো একটি অনিরাপদ কারখানা থেকে ক্রেতা পণ্য আমদানি করছে, যেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়- পুরো শিল্পের সুনাম নষ্ট করতে এমন একটি সংবাদই যথেষ্ট। আমাদের দেশে বিশ্বমানের অনেক পোশাক কারখানা রয়েছে। তা সত্ত্বেও এখনও অল্প কিছু কারখানার ত্রুটির কারণে পুরো শিল্পের সাফল্য ও সুনাম ঢাকা পড়ে যায়। কাজেই আমাদের শিল্পের বিশ্বমানের হয়ে ওঠার এখনই সময়।
  ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক; বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী

মন্তব্য করুন