শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটের কাছে সোমবার বেপরোয়া গতির স্পিডবোট দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা যেমন বেদনাদায়ক তেমনই বিক্ষোভ জাগানিয়া। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া ২৬টি নিথর দেহ আমাদের নতুন করে দাঁড় করিয়েছে পুরোনো কিছু প্রশ্নের সামনে। করোনাকালে চলমান লকডাউনের মধ্যে কী করে এই নৌযানগুলো চলছিল- প্রথমেই আসে এ প্রশ্ন। আমরা জানি, এই নৌযানগুলোর ধারণক্ষমতা ১২ থেকে ১৪ জন। কিন্তু মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সোমবার সকালে ওই স্পিডবোটটি মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩২ যাত্রী নিয়ে বাংলাবাজার ঘাটের দিকে যাচ্ছিল। বেপরোয়া গতির স্পিডবোটটি কাঁঠালবাড়ী এলাকায় নদীতীরে নোঙর করা একটি বালুবোঝাই বাল্ক্কহেডকে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই ঘটে যাত্রীদের সলিলসমাধি। শীতলক্ষ্যার পর এবার পদ্মাতীরে আমাদের দেখতে হলো লাশের সারি। দুর্ঘটনার পর সরকারি দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে দায় এড়ানোর যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তাও বিস্ময়কর। লকডাউনের মধ্যে উভয়দিকের ফেরিঘাটের পুলিশ ফাঁড়ির নৌ পুলিশ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলদের নাকের ডগায় কী করে এমন যাত্রীঠাসা স্পিডবোটগুলো চলছিল? দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে রচিত হয় সলিল সমাধিক্ষেত্র। জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে যারা এমন অপকর্ম চালাচ্ছিল, তাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব নৌযানে থাকে না কোনো লাইফ জ্যাকেট- তা অতীতে যেমন দেখেছি, এবারও তা-ই দেখা গেল। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দেশের নৌযানগুলোর এমন ঝুঁকিপূর্ণ চলাফেরা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা বিস্মৃত হইনি গত মাসের ৪ তারিখ নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে বেপরোয়া কার্গোর ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে সেই মর্মান্তিকতার কথা। ওই কার্গোটিরও কোনো অনুমোদন ছিল না। এ রকম নজির আছে অনেক। আমরা জানি, এর আগে বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেসব কমিটির অনেক তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখই দেখেনি। আবার যেগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও প্রতিকারের সুপারিশ করা হয়েছিল, তাও অনেক ক্ষেত্রে পড়ে আছে হিমঘরে! কাঁঠালবাড়ী ঘাটের ওই ঘটনায়ও যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিকার কী হবে- তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নদীপথে দুর্ঘটনা রোধে উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। দায়িত্বশীলদের নির্লিপ্ততা কোনোভাবেই ছাড়যোগ্য নয়। ঘটনান্তে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনার পর সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের দৃশ্যত তোড়জোড় লক্ষ্য করা গেলেও চূড়ান্ত অর্থে প্রায় সবকিছুই থেকে যায় প্রতিকারহীন। এমন দায়িত্বহীনতা-উদাসীনতা-স্বেচ্ছাচারিতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বহুমাত্রিক অপরাধ আর দায়হীনতার মাশুল মানুষ জীবন দিয়ে দিতেই থাকবে- এমনটি চলতে দেওয়া যায় না। বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ে নৌ দুর্ঘটনায় ১৮ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি, আর প্রায় ৯০০ জনের নিখোঁজ হওয়ার তথ্যই স্পষ্ট বলে দেয়- কী বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে আমাদের নৌপথ! আমরা মনে করি, নৌপথ সুরক্ষায় দায়িত্বশীলদের অবহেলা-ব্যর্থতাও অপরাধের শামিল। নৌপথে শৃঙ্খলা আনতে হলে ছোট-বড় সব পক্ষকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। আমরা দেখতে চাইব, কাঁঠালবাড়ী এলাকায় এই মর্মন্তুদ ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের মধ্য দিয়ে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। পদ্মার নৌযান দুর্ঘটনাটিই হোক বেদনা-কান্নার শেষ অধ্যায়। আমরা বিশ্বাস করি, সব পক্ষ আন্তরিক হলে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন