রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'নিজের পায়ে' দাঁড়াতে হবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশনায় জনপ্রত্যাশাই প্রতিফলিত হয়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি তথা একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যও যথার্থ- ব্যাংক-বীমা, টেলিযোগাযোগ, পর্যটন খাতে 'সরকারি কোম্পানি' বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় অর্থে 'পরিচালিত' হতে পারে না। বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিকবার এমন তাগিদ দিয়েছি। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, নাগরিকদের সুবিধার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহনের মতো সেবা খাতগুলোতে সরকারের সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়া উচিত। উন্নত ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেটাই সঙ্গত। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান গঠনই করা হয় 'কোম্পানি' হিসেবে এবং যেগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারে, তাদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা চলবে কেন? কেবল কোম্পানিগুলো 'সচল' রাখা নয়; নিজস্ব বিনিয়োগে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা। বাস্তবে যদিও আমরা উল্টো চিত্র দেখে থাকি। অথচ সরকারি পুঁজি, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনাগত সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও যুগের পর যুগ লোকসানি খাত হিসেবে এগুলো 'টিকে থাকে'। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কথা।

আমাদের মনে আছে, করোনা পরিস্থিতির আগে খোদ অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, মূলধন ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে আর অর্থ দেবে না সরকার। কারণ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে, তার ভিত্তিতে বরং বাড়তি মুনাফা করা উচিত। অথচ মুনাফা দূরে থাক, প্রতি বছর ওইসব ব্যাংক লোকসানের ভাঙা রেকর্ড শোনায়। আর প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লোকসান পূরণ করতে হয়। আমরা মনে করি, এভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বছর বছর রাষ্ট্রের অর্থ ঢালার মধ্য দিয়ে আসলে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষের অদক্ষতা ও ব্যর্থতার দায় গোটা জাতির ওপরে চাপানো হয়ে থাকে। এই প্রশ্ন অন্যায্য হতে পারে না- ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষকে সুবিধা দিতে সাধারণ নাগরিকরা এই লোকসানের বোঝা কতদিন বহন করে চলবে? আমরা জানি, তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রায়ত্ত যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা 'নিশ্চিত চাকরি' পাওয়ায় উদ্যম ও উদ্ভাবনে আন্তরিক থাকে না। তারা দক্ষতার বদলে দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নিজস্ব আয় থেকে পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের প্রশ্ন যখন আসবে, তখন মুনাফা করা এমনকি সরকারকে রাজস্বের জোগান দেওয়ার ব্যবস্থাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নতুন নিয়োগ, ছাঁটাই, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। আশার কথা, বিলম্বে হলেও এ ধারা সূচিত হতে দেখেছি আমরা।

ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করেছে সরকার। অস্বীকার করা যাবে না যে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করতে গেলে অনেক শ্রমিক-কর্মচারী নিয়মিত কাজ হারায়। কিন্তু লোকসানের দুষ্টচক্র রোধ করতে হলে এর বিকল্পও নেই। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানি হয়ে ওঠে না। দলাদলি, স্বজনপ্রীতি, কায়েমি স্বার্থও সমান দায়ী। অনিয়ম বন্ধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের 'নিজের পায়ে' দাঁড়ানো দরকার। পাশাপাশি অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও সংস্কার-অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আধুনিক উৎপাদন, সেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নতুন প্রযুক্তিও প্রয়োজন। ফলে সবকিছু ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এগুলোর জনবল ও দক্ষতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাইব- রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কর্মী সংগঠন, রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজ ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান লাভজনক হওয়ার নজির আমাদের আশপাশের দেশগুলোতেই রয়েছে। সীমিত আয়তনে বিপুল জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তার এই দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক হতে পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পারবে না কেন? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করা একটি দেশে এমন প্রত্যাশা অসঙ্গত হতে পারে না।

বিষয় : রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান

মন্তব্য করুন