আমরা এমন একটি নগরীতে বসবাস করি, যে নগরীর বায়ু প্রায় সময়ই বিশ্বের 'সবচেয়ে দূষিত' তকমা পায়। যে কোনো আদর্শ নগরীতে সবুজের পরিমাণ থাকতে হয় ২০ ভাগ, আমাদের নগরী ঢাকায় সবুজের পরিমাণ ৫ ভাগের নিচে। এখানে গত কয়েক বছরে যেভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। বায়ুদূষণ রোধ, তাপমাত্রা কম রাখা, নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনসহ সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের জন্য গাছ, পার্ক ও উদ্যানের প্রয়োজন। রাজধানী শহর ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে মহাপরিকল্পনা হয়েছিল সেখানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ওসমানী উদ্যান ও রমনা উদ্যানকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এগুলোকে নগরীর ফুসফুস বিবেচনা করা হয়।

অসম্ভব ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগরীও বটে। বিগত সময়ে নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকার পরিবেশ-প্রকৃতি। এর পরও ঢাকার যে সবুজ অংশগুলো এখনও টিকে আছে তার মধ্যে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ওসমানী উদ্যান ও রমনা উদ্যানের নাম সরাসরি বলতে পারি। এই তিনটি উদ্যানের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। কাজেই এ উদ্যানগুলো অন্য যে কোনো উদ্যানের মতো নয়।

কারণ এ উদ্যানগুলো নগরীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে এবং এগুলোর ঐতিহাসিক আবেদন রয়েছে।

আমাদের দেশের উন্মুক্ত স্থানগুলো একের পর এক দখলে বা অপব্যবহারে চলে যাচ্ছিল। এ জন্য আইন করে বলা হয়েছে- 'পার্ক, উদ্যান, জলাশয় সব রক্ষা করতে হবে। কেউ যদি শ্রেণি পরিবর্তন করতে চায় তাহলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে। তবে মাস্টারপ্ল্যানের উদ্দেশ্য ব্যাহত করে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।' কিন্তু ২০০৭ সালে দেখা গেল গণপূর্ত অধিদপ্তর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ২৫ একর জমি (ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের গেট থেকে তিন নেতার মাজার পর্যন্ত) ঢাকা ক্লাবকে প্রদান করে গলফ ক্লাব বানানোর জন্য। এভাবে একটি পাবলিক প্লেস দেওয়া হলো একটি ক্লাবকে! তখন এ নিয়ে আইনি লড়াই হয় এবং আমরা তাতে জয়ী হই। সেখানে আদালতের ভাষ্য এমন ছিল- 'এই উদ্যানকে রক্ষা করতে হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর কোন আইনবলে এই ২৫ একর জমি প্রদান করল, তারা তো এটা দিতে পারে না। এক. পাবলিক প্রপার্টি তারা অন্য কাউকে প্রদান করতে পারে না, দুই. তারা উন্মুক্ত স্থানের শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারে না। কারণ সবসময় উদ্যানটি পাবলিকের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।' আদালতের রায়ে তা বাতিল হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত বললেন- 'সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে অংশটুকু স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত, সেখানে স্তম্ভ-ভাস্কর্য করা হোক।' বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে অংশটুকুতে শিশুপার্ক রয়েছে, সে অংশটুকুই মূলত স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত। কিন্তু স্বাধীনতার সেই স্থান সংরক্ষণের নামে নির্ধারিত স্থানের বাইরে এমনকি উদ্যানজুড়েই 'নির্মাণযজ্ঞ' বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চলছে।

উদ্যান বলতে আমরা বুঝি সবুজে ঘেরা কোনো জায়গা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একসময় ময়দান ছিল, পরে এটা উদ্যানে পরিণত হয়েছে। এই উদ্যানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল এই উদ্যানে, স্বাধীনতার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও এই উদ্যানে বক্তব্য রেখেছিলেন। এসব স্মৃতির সঙ্গে উদ্যানের যে স্থানগুলো জড়িত, সেসব স্থানে কিছু স্থাপনা থাকতেই পারে। স্বাধীনতার স্মৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এসব স্থাপনা নির্মাণের স্বার্থে যদি গাছ কাটা হতো, আমরা আপত্তি করতাম না। কিন্তু এখন যেসব স্থানে গাছ কাটা হচ্ছে সেসব স্থানে এসব ঐতিহাসিক ঘটনার কোনোটিই ঘটেনি। মনে রাখা দরকার, ইতিহাস সংগ্রহ করতে হলে যে জায়গায় ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সেই জায়গাটি সেই আবেগ ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু তা না করে চারদিকের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যে গাছগুলো সাংঘাতিকভাবে দূষিত জনবহুল নগরী ঢাকার জন্য কিছুটা হলেও অক্সিজেন ধারণ ও সরবরাহ করছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষণে যে পরিকল্পনা করা হয়েছে সেই পরিকল্পনা আমরা নিশ্চয়ই সমর্থন করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এ পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করাই হয়নি। এটা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এ ধরনের পরিকল্পনার বাণিজ্যিক কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। উদ্যানে হাঁটতে হলে কংক্রিটের ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে, ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটা যাবে না- এগুলো অসার যুক্তি। যদি সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য টাইলস লাগানোর মতো পরিকল্পনা করা হয়, তার জন্য গাছ কাটতে হবে কেন? আর টাইলস যদি লাগানো হয় তাহলে তো তা আর উদ্যান থাকে না। আবার বলা হচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে সেখানে গাছ লাগানো হয়েছিল, এসব গাছ কেটে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো হবে। যারা এই পরিকল্পনা করেছেন, তারা কি বৃক্ষ বিশেষজ্ঞ? কোন গাছ লাগালে নগরের পরিবেশ বেশি উপকৃত হবে, হারিয়ে যাওয়া পাখিগুলোর আশ্রয় হবে, হাঁটতে যাওয়া মানুষের বিশ্রাম হবে, সে বিষয়গুলো তো বৃক্ষ বিশেষজ্ঞরা জানেন। এখন বলা হচ্ছে, সেখানে ফুলের গাছ লাগানো হবে। যদি ফুলের গাছ লাগানো হয়, তাহলে পথচারীরা কি ছায়া পাবে?

নগরীতে এমনিতে গাছ কম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে গাছগুলো আছে সেগুলোর কারণে তো কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। ঝড়ের সময় গাছগুলো ভেঙে পড়ে জনভোগান্তির কারণ হতে পারে, সে রকম বাস্তবতাও সেখানে নেই। তাহলে এটা অপরিকল্পিত হয় কী করে? বস্তুত প্রাকৃতিক যে কোনো কিছুকেই অপরিকল্পিত বলা যায় না। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

বলা হয়েছে, সেখানে এক হাজার গাছ লাগানো হবে। আমরা এটাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ৩০-৪০ বছর বয়সী দুই-আড়াইশ গাছ কেটে সেখানে এক হাজার চারাগাছ লাগানোর পরিকল্পনা অযৌক্তিক। কারণ যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে সেগুলোর পরিবেশগত আবেদন আর যে চারা লাগানো হবে সেগুলোর পরিবেশগত আবেদন এক হতে পারে না। সরকার যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তার অধীনে স্বাধীনতার স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাগুলো বাস্তবায়ন করা হোক। কিন্তু স্বাধীনতার স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় যেমন রেস্তোরাঁ, ওয়াকওয়ে ইত্যাদি নির্মাণের জন্য গাছ কাটা যেমন আইনানুগ হবে না, তেমনি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীলও হবে না। ২০০০ সালের ৩৬ নম্বর আইন অনুযায়ী শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে। এখন উদ্যানকে যেভাবে রেস্টুরেন্ট মহলে পরিণত করা হচ্ছে তার জন্য কি অনুমতি নেওয়া হয়েছিল? এই ছোট্ট উদ্যানে যদি সাতটি রেস্টুরেন্ট থাকে তাহলে কি সেটা উদ্যান থাকবে? কাজেই প্রকল্পটি পর্যালোচনা ও পুনর্বিন্যাস করে বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো বাদ দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে যে গাছগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোর স্থলে একই প্রজাতির তিনগুণ গাছ লাগানো হোক। আর স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ হোক। তবে সেখানে কোনো ধরনের বাণিজ্যিকীকরণ যেন না হয়, সবুজ যেন খয়েরি না হয়।

প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি, বেলা