বছর ঘুরে আসা ঈদুল ফিতর গতবারের মতো এবারও এসেছে দুর্যোগের আবহে। দীর্ঘ এক মাস সংযম সাধনার পুরোটা সময় দেশবাসীর লকডাউনের মধ্যে কাটলেও এবারের ঈদ ভিন্নমাত্রার খুশি নিয়ে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। বস্তুত প্রায় দুই মাস ধরে বিশ্বের অনেক দেশেই করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ দেখছি আমরা; যা বাংলাদেশসহ কোনো কোনো দেশে প্রথমবারের চেয়েও মারাত্মক। এ অবস্থায় ঈদ উৎসব উদযাপনেও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ইতোমধ্যে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; খোলা ময়দানের পরিবর্তে গতবারের মতো এবারও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে মসজিদে। দেশের সবচেয়ে বড় শোলাকিয়া ঈদগাহে এবারও ঈদের নামাজ হবে না। শহুরে মানুষের বাড়িফেরা ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ হলেও করোনার এ সময়ে তাতে ব্যত্যয় ঘটছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনের তরফ থেকে ঈদে বাড়ি যাওয়া অনূৎসাহিত করা হলেও অনেকেই 'নাড়ির টানে' নানাভাবে বাড়ি ফিরছেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও গ্রামমুখী মানুষের ঢল ঠেকানো যাচ্ছে না। ফেরি খুলে দেওয়ার মাধ্যমে এবং আন্তঃজেলা পরিবহন চলাচল করার কারণে এখন স্বাভাবিক সময়ের মতোই অনেকে বাড়ি যাচ্ছেন! গত দু'দিন ধরে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছি। একদিকে স্বাস্থ্যবিধি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা না মেনে দলে দলে মানুষের বাড়ি যাওয়ার ফলে যেমন করোনাভাইরাসের বিস্তারের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা এবং তার চেয়ে বড় বিষয়, বাংলাদেশে করোনার ভয়ংকর ভারতীয় ধরনের উপস্থিতি। ভারতীয় ধরন খুব দ্রুত ছড়ানোর ফলে একই সঙ্গে প্রাণঘাতী বিধায় অধিক সতর্কতার বিকল্প নেই। বাড়িফেরত মানুষদের একসঙ্গে আসতে না দিয়ে আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্তত এটা নিশ্চিত করুক, করোনার উপসর্গ নিয়ে কেউ বাড়ি যাচ্ছে না। করোনার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ গ্রাম এখনও অনেকটাই নিরাপদ। অবাধে দল বেঁধে মানুষ বাড়ি গেলে গ্রামে করোনাভাইরাস ছড়ালে ঈদের আনন্দ কেবল বিষাদেই পরিণত হবে না বরং তা বহুবিধ সংকটও তৈরি করবে। এবারের ঈদুল ফিতরের আগে ফিলিস্তিনের আল আকসা মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী যেভাবে হামলা করেছে, তাতে নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরাও মনে করি, 'মসজিদে আল আকসায় হামলা, শেখ জাররাহপাড়ায় ফিলিস্তিনি পরিবারদের উচ্ছেদ এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরিত করা মানবিক মানদ, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির লঙ্ঘন।' দীর্ঘমেয়াদি এ সংকটের প্রতিবিধানে বিশ্বকে এগিয়ে আসতেই হবে। আমরা জানি, পবিত্র রমজানের সামাজিক, মানসিক, আত্মিক তথা বহুবিধ উপকার রয়েছে। মুসলমানরা দীর্ঘ এক মাস ধরে সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে যে সংযমের অনুশীলন করেন, তা শুধু ইন্দ্রিয়ের কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য-পানীয় থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, অপরাধপ্রবণতা ইত্যাদি রিপুর তাড়না থেকে বেঁচে থাকাও সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য। রোজা পালনের মাধ্যমে অন্যায়, অবিচার ও বিদ্বেষ দূর করে পরার্থপরতায় সুখী ও শান্তিময় জীবন ও সমাজ গড়ার প্রয়াসও রয়েছে। এমনকি সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে রমজান মাসেই মুসলমানরা জাকাত আদায় করে থাকেন। ঈদুল ফিতরের আগেই গরিবের পাশে দাঁড়ানোর অন্যতম মাধ্যম সদকাতুল ফিতর। আমরা দেখেছি, চলমান করোনা দুর্যোগের কারণে কর্মহীন, গরিব, অসহায়ের পাশে অনেকেই দাঁড়িয়েছেন। মূলত এই সহমর্মিতা, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষাই দেয় ঈদুল ফিতর। দুর্যোগের আবহে এবারের উৎসবে আমরা প্রত্যাশা করি, সবাই মিলেই দেশের দুর্দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব হবে। এবারের উৎসব আনন্দে আতিশয্যে নয় বরং পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে পালন করা জরুরি। করোনা দুর্যোগ থেকে নিজে নিরাপদ থাকা এবং অন্যকে নিরাপদ রাখাও এবারের ঈদে আনন্দ। আমরা প্রত্যাশা করি, দুর্যোগের আঁধার কেটে গিয়ে সবাই শিগগিরই স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরবে। সমকালের পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে আমরা জানাই ঈদ মোবারক।

মন্তব্য করুন