খুব মন খারাপ করা এক একটা দিন যাচ্ছে। কভিড-১৯ এর দাপটে কাঁপছে পৃথিবী। ভাইরাস তার স্বভাববশতই পাল্টে যাচ্ছে, তৈরি করছে নতুন নতুন ভেরিয়েন্ট। এরই কোনো কোনোটা একে আরও সংক্রমণপ্রবণ এবং উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সে কারণেই চলছে এবং চলবে গবেষণা। তৈরি করতে হচ্ছে এবং হবে কার্যকর ভ্যাকসিন। জীববিজ্ঞানের এ শাখাটার দিকে বেশ মনোযোগ দিতে হবে বৈকি।

জীবকণা ছাড়াও আরও কত জীবাণু রয়েছে পৃথিবীতে। জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষ- সর্বত্রই তাদের বিচরণ। খুদে যে ব্যাকটেরিয়া থাকে আমাদের অলক্ষে যত্রতত্র, সেগুলোরও কত ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। আমাদের নির্মল হাওয়া, আবর্জনামুক্ত আবাসস্থল আর খাদ্য ও পুষ্টির বড় এক নিয়ামকই তো এগুলো। জীববিজ্ঞানের আধুনিক শাখা যে মলিকুলার বায়োলজি, এগুলো ছাড়া সেটিও পড়ত মুখ থুবড়ে কবেই। নানা রকম এনজাইম তৈরি করে, কখনও বাহক হিসেবে ব্যবহূত হয়ে কিংবা মেশিনের মতো ব্যবহূত হয়ে জিন প্রকৌশল, টিস্যু কালচার, জেনোমিক সিকোয়েন্স সব শাখার প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করছে এগুলো।

জীবজগতের কোনো জীবই ফেলনা নয়। সব জীবেরই খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা রয়েছে। মানুষ ছাড়া সব জীবই খাদ্যের জন্য তার প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। মানুষের তার খাদ্য ও পুষ্টির জন্য কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে থাকার কোনো উপায় নেই। খাদ্য ও পুষ্টির জন্য বড় বেশি পরনির্ভর আমরা। অনেক শ্রম ঘাম ঝরিয়ে খাদ্য আর পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করতে হয়। প্রকৃতির নিজস্ব পরিবর্তন আর মানুষ তার দীর্ঘ যাচাই-বাছাই আর নির্বাচনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বুনো পরিবেশ থেকে বাছাই করে নিয়েছে শতাধিক ফসল প্রজাতি, অর্ধশতাধিক গবাদি পশু ও পোষ মানানো পাখি এবং পেয়েছে প্রাকৃতিক জলাশয়ে শত শত প্রজাতির মৎস্য। এদের অবলম্বন করে শুরু হয়েছে ফসল ফলানো, পশুপালন আর মৎস্য আহরণ ও মৎস্য চাষ। এসবই নানা রকম জীব-প্রজাতিরই অংশ। আধুনিককালে এসে গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে ফসলের নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল জাত। এসব নতুন জাত বা ব্রিড আর নানা রকম উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কারণে কৃষির উৎপাদন বেড়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে আমাদের। তদুপরি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর যে অভিঘাত সৃষ্টি করছে তা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে প্রয়োজন আরও অধ্যয়ন ও গভীর পর্যবেক্ষণ ও নিরলস গবেষণা। সেজন্য জীববিজ্ঞান অধ্যয়নে প্রয়োজন আরও বেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ।

কভিড অতিমারিতেও থেমে নেই জীবন। সেই জীবন ও জীবকে ধারণ করেই জীববিজ্ঞান। নানা রকম জীবের বহুমাত্রিক বিষয়-আশয়, এর চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও এর সঙ্গে জীবের জটিল মিথস্ট্ক্রিয়া নিয়েই এই বিজ্ঞান। এরই মধ্যে যত আনন্দ-বেদনা, সুখ-শোক, আর যত কান্না-হাসি। প্রকাশের ভিন্নতা রয়েছে বটে, তবু এসব আছে। জীবন যখন অন্য জীব-জীবাণু-জীবকণা কিংবা প্রাকৃতিক কোনো কারণে কোনো বিপদের মধ্যে পড়ে, জীববিজ্ঞান চর্চা তখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জীব তখন অনুপুঙ্খ ভাবনার আবশ্যক বিষয়বস্তু হয়। তখন জীবের ভেতর-বাইরে বিস্তারিত জানা এবং একে মানুষের কল্যাণে লাগানোর জন্য প্রয়োজন অধ্যয়ন ও গবেষণা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন বিষয়-আশয়তো আসলে জীববিজ্ঞানেরই এক ফলিত রূপ। এর জন্য প্রয়োজন হয় গভীর অভিনিবেশ ও হাতেকলমে শিক্ষা। জীববিজ্ঞান চর্চা তখন একান্ত আবশ্যক হয়ে ওঠে।

জীববিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র বিশাল। জীবের অন্তর্গত রহস্য উন্মোচন করতে হয় বলে গবেষণার ক্ষেত্রও বিশাল। একেকটি জীবের রয়েছে স্বতন্ত্র এবং বেশ খানিক ভিন্ন রকম জীবন পদ্ধতি ও কৌশল। কত জীবের তো সন্ধানই মেলেনি এখনও। এখনও কত জীবের নামকরণই করা হয়নি। কে জানে এদের মধ্যে কত জীব রয়েছে আগামী দিনে যাদের ব্যবহার করা সম্ভব হবে মানুষের কল্যাণে। এমনি কত অজানা আর কম জানা বিষয় রয়েছে। আমাদের অলক্ষে প্রাণের যে অবারিত প্রবাহ রয়েছে, একে প্রাণপ্রবাহের সঙ্গে না মেলালে প্রাণের উৎসব অর্থবহ হয়ে উঠবে কেন? সেজন্যই ঘটা করে প্রাণের উৎসবের আয়োজন প্রতি বছর। কভিডের কারণে সামনা-সামনি হওয়ার সুযোগ নেই বটে। তাতে কি? অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তো রয়েছে। এর মাধ্যমেই তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে প্রাণের উৎসব। এভাবেই সম্পন্ন হয়েছে আঞ্চলিক ও জাতীয় উৎসব। প্রাণের মিলনে প্রাণের সন্ধান লাভ। একে বলি জীববিজ্ঞান উৎসব, বলি বায়োলজি অলিম্পিয়াড। আজ ২২ মে। জমবে আবার সেই প্রাণের উৎসব। তার মানে বায়োলজি অলিম্পিয়াডের জাতীয় উৎসব। সে উৎসবে অনেকে জিতবে মেডেল। অনেকে নতুন আশায় আগামী দিনের জন্য নিজেকে তৈরি করবে। যারা জয়ী হবে আগেভাগে তাদের জানাই অভিনন্দন।

কেবল দেশে নয় আন্তর্জাতিক আসরেও চলে যায় আমাদের সেরা প্রতিযোগীরা। অতিমারিকালেও অদম্য তরুণদের নিয়ে দেশে থেকেই অনলাইনে চলে আন্তর্জাতিক বায়োলজি অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ। প্রায় প্রতি আসরেই ধারাবাহিক কয়েক বছর আমাদের প্রতিযোগীরা অর্জন করছে মেডেল। বিদেশের মাটিতে উজ্জ্বল করেছে তারা দেশের মুখ। এবার লিসবনে অনুষ্ঠিতব্য ৩২তম আন্তর্জাতিক আসরেও বরাবরের মতো আমাদের প্রতিযোগীরা অংশ নেবে জুলাই মাসে। নিশ্চয় জিতবে কোনো না কোনো মেডেল। উজ্জ্বল করবে আমাদের মুখ আবারও। শুভ কামনা তাদের জন্যও।

সভাপতি, বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কেন্দ্রীয় কমিটি

মন্তব্য করুন