আশার কথা, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে নদী সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। প্রতি বছর বাজেটে ক্রমে বেড়েছে নদীর জন্য বরাদ্দ। নদী সুরক্ষায় সরকারের নীতিগত আগ্রহও আমাদের আশাবাদী করে। একই সঙ্গে অস্বীকার করা যাবে না- বাজেটে নদীর জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। যে দেশের অর্থনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যোগযোগ, প্রতিবেশ, উৎপাদন ব্যবস্থা, এমনকি প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা নদীনির্ভর, সেই দেশের জাতীয় বাজেটে নদীর জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানো দরকার। নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদ বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পক্ষে আমরা প্রথম থেকেই এ দাবি জানিয়ে আসছি।
বাজেটে নদী সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারও যদি পূর্ণ সদ্ব্যবহার সম্ভত হতো, তাহলেও এদেশে নদ-নদীর প্রতিবেশ পরিস্থিতি বহুলাংশে উন্নত হতো বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা দেখি, প্রতি অর্থবছরে বাজেটে নদীর জন্য বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার আওতায় গৃহীত নদী সুরক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্প ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলে। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে নদীর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং তখন বরাদ্দ অর্থ অপ্রতুল হয়ে পড়ে।
বাজেটে প্রাপ্ত বরাদ্দে নদী সুরক্ষা কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনার চিত্রও আমাদের দেশে কম নেই। সামগ্রিকতার প্রশ্নটিও মনে রাখা জরুরি। একদিকে যদি নদী উদ্ধার কার্যক্রম চলতে থাকে; অপরদিকে নদী হত্যার অপকর্মও থেমে না থাকে, তাহলে তো সকলই গরল ভেল! আমরা সম্প্রতি দেখছি, কর্ণফুলী নদীর একদিকে খনন চলছে, অন্যদিকে শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলে সে নদীকে আবার খননের আগের বা তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাজেটে নদী খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দের বহুলাংশই নদী খননের জন্য। এই নদী খনন নিয়েও রয়েছে অনেক অভিযোগ। সঠিক তদারকির অভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের পকেটই ভারি হয়; নদী উদ্ধারের কার্যক্রম রয়ে যায় তিমিরেই। অনেক সময় 'খরচ কমানোর জন্য' নদীর তলদেশ থেকে মাটি বা বালু তুলে খুব কাছেই রেখে দেওয়া হয়, যা পরে আবার ভেঙে নদীতেই পড়ে!
আমরা দেখি, সামান্য রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য নামমাত্র ইজারায় 'বালুমহাল' বরাদ্দ দেওয়ায় নদ-নদী এবং বৃহত্তর অর্থে দেশের প্রতিবেশ ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বাজেট যেহেতু একটি দেশের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয় উভয়েরই হিসাব; আমরা মনে করি, নির্বিচার বালু উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত লাভ-ক্ষতির হিসাব করা এখন সময়ের দাবি। উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইজারার আগেই নিয়ম ও নজরদারি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
নদীভাঙন-প্রবণ এলাকাতেও সরকারি বরাদ্দ থাকে, কিন্তু তা ভাঙন রোধের প্রচেষ্টায়। নদীভাঙন যেহেতু পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়; প্রাকৃতিক নিয়মেও প্রতি বছর নদী ভাঙে। তাই ঝুঁকি নিয়ে যারা ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাস করে বা করতে হয় এবং ভাঙনের কবলে সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়, তাদের জন্য সরাসরি বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। ভাঙনকবলিত এলাকায় নদীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে- নদী শুধু নেয়। নদী যে অনেক কিছু দিতেও পারে- তা এই মানুষদের বুঝতেই দেওয়া হয় না। নদীতে এই অসহায় মানুষ বসতভিটাসহ সব হারাচ্ছে, আর নদী দখল করছে কিছু মাফিয়া চক্র। ভাঙন রোধের বেলায়ও চলে বৈষম্য। নদীর যে পাশে বা যে অংশে প্রভাবশালী মানুষের বসবাস, সেখানে প্রকল্পগুলো তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হয়। উপেক্ষিত থাকে গরিব ও অসহায় মানুষ।
মনে রাখতে হবে, নদী দখল ও দূষণ রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি ও আয় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের লোভ ও মুনাফার কারণে জাতীয় সম্পদ নদী বিনষ্ট হয়। সেই নদী উদ্ধার করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক? 'পল্যুটারস পে' নীতি মেনে যারা দখল-দূষণ করছে, তাদেরকে জরিমানার মাধ্যমেই নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার কর্মসূচি নেওয়া উচিত। এই দিকনির্দেশনা আমরা আসন্ন বাজেটে দেখতে চাই।
প্রসঙ্গক্রমে আমরা বলতে চাই- নদী সুরক্ষা, উদ্ধার বা খননের জন্য যে বরাদ্দ বা বাজেট বরাদ্দ হয়, তা পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে বাস্তবায়ন হওয়া উচিত নয়। এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়; অন্যদিকে এর গুরুত্বপূর্ণ 'একাডেমিক' অংশও যে আছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। গবেষক, বিশেষজ্ঞ বা একাডেমিশিয়ানদের শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজে লাগালে হবে না, তাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল ভূমিকায় রাখতে হবে।
আসন্ন বাজেটে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করা যায়, সে ব্যাপারে দিকনির্দেশনা ও বরাদ্দ প্রত্যাশা করি আমরা।
আমরা মনে করি, নদ-নদীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা না গেলে নদী সুরক্ষায় জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হবে না। তাই নদীতে সরকারের ব্যয়ে হিসাবের পাশাপাশি কীভাবে আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে; আসন্ন বাজেটে তার একটি চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে।
আমরা জানি, বাংলাদেশে নদ-নদী 'জীবন্ত সত্তা' হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। এসব নদীর জীবন ফিরিয়ে দেওয়া এবং আর মরতে না দেওয়ার ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ফলনির্ধারণী ভূমিকা রাখা নদ-নদীকে উদ্ধার এবং প্রকৃত জীবন ও মর্যাদা দেওয়ার এখনই সময়। জাতীয় বাজেট হতে পারে তার উপযুক্ত উপলক্ষ।

লেখকবৃন্দ নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদ বিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের সঙ্গে যুক্ত
www.riverinepeople.org

বিষয় : নদী সুরক্ষা ও বাজেট

মন্তব্য করুন