সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে চলছে অমানবিকভাবে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের লাগাতার রক্তপাত। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সংঘাতে জীবন গেছে বহু মানুষের। চলেছে শিশু ও নারীর ওপর নির্মম হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে এবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংকট এখনও বহাল। কারণ, সংকটের কার্যকর সমাধান খোঁজা হয়নি। এই ব্যর্থতা অবশ্যই বিশ্ব-মোড়লদের, যারা সভ্যতা, সুবিচার ও মানবাধিকারের কথা বলেন।
এই সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তা অর্থবহ হয়নি। এবারের সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জোর দিয়ে বলেছেন, এই সংঘাতের একমাত্র সমাধান দুটি রাষ্ট্রের পত্তন করা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত অবস্থানের পুনরুক্তি করে মি. বাইডেন এটিও উল্লেখ করেছেন, যতদিন ইসরায়েলের অস্তিত্ব 'দ্ব্যর্থহীনভাবে' স্বীকার করা না হবে, ততদিন 'শান্তি আসবে না'।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসানে 'দুই রাষ্ট্র তত্ত্ব' নতুন কিছু নয়। এ উদ্যোগের মূল ভিত্তি ইসরায়েলের পাশাপাশি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জেরুজালেমকে দুই রাষ্ট্রের রাজধানী করা। ট্রাম্পের উপদেষ্টা জ্যারাড কুশনারের শান্তি পরিকল্পনাতেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সীমিত সার্বভৌমত্ব দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। ফলে ফিলিস্তিনি এবং তাদের সমর্থকরা সে পরিকল্পনা নাকচ করেছেন। চরমপন্থি ট্রাম্পকে হটিয়ে বাইডেন নতুন ইতিহাস ও নতুন আশা সৃষ্টি করেছেন। তার নীতি-অবস্থানে নতুনত্ব আসুক- সেটিই প্রত্যাশিত; যদিও সামনের দিনগুলোতে তিনি কতটা যান, তারই ওপর বিচার নির্ভর করবে।
এই দুই রাষ্ট্র সমাধান তত্ত্বে ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য থাকার কথা আছে, যা ফিলিস্তিনিরা গ্রহণ করেনি। কারণ তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং ঐতিহাসিকভাবেও সত্য যে, আরবদের উৎখাত করেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের পত্তন করা হয়েছিল। এই তত্ত্বকে বহু দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা সমর্থন জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে নানা স্তরে আলোচনাও হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন পেরেজের সঙ্গে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেছেন। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ, স্বাধীন ফিলিস্তিনের সীমান্ত নির্ধারণ, জেরুজালেমের অধিকার, নতুন ইহুদি বসতি ইত্যাদি প্রশ্ন নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এই প্রশ্নও উঠেছে- ইসরায়েল কি দেশটিকে ধর্মরাষ্ট্র রাখতে চায়, নাকি গণতান্ত্রিক? খোদ ইসরায়েলেও এ বিতর্কের অবসান হয়নি। কারণ বেশিরভাগ মানুষ ইহুদি সংখ্যাগুরু রাষ্ট্রের পক্ষে। এদিকে সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে ততই পরিস্থিতি স্বরূপ পাল্টাচ্ছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সে মানুষ বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি, কখনও ইসরায়েলি। ভাবতে হবে, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যা যেখানে ৯০ লাখ, তখন একমাত্র অধিকৃত এলাকাতেই ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। অতএব যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সর্বশেষ সংঘর্ষ সাম্প্রতিক বছরের বড় রক্তপাত। একদিকে চলেছে হামাসের লাগাতার রকেট হামলা, অন্যদিকে গাজার ওপর ইসরায়েলের আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার। এসব হামলায় স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ অস্ত্রে সজ্জিত ফিলিস্তিনিদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধ করার মানসিকতা বাদ দিয়েছে; পরাজয় মেনে নিয়েছে- এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। কারণ সাম্প্রতিক যুদ্ধে হামাস দেখিয়েছে, তারা ইসরায়েলের অধিকতর ক্ষতিসাধন করতে পারত, যদি তার যোগ্য সমরশক্তি থাকত। অন্যদিকে এই নতুন রক্তপাতে জর্ডান, মিসর এবং আরব বিশ্বের মধ্যপন্থি দেশগুলোতে ফিলিস্তিনি ইস্যু নিয়ে নতুনভাবে জনমত তৈরি হবে, সেটিই স্বাভাবিক। অন্যদিকে সিরিয়া, ইরান এবং হিজবুল্লাহর নতুন প্রস্তুতিকে অস্বীকার করছেন না অনেকেই। শুধু তাই নয়, রাশিয়া, চীন এবং তুরস্ক কৌশলগত কারণে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছেছে।

অব্যাহত সংঘাতের বাতাবরণে একদিকে যেমন বেড়েছে উগ্র ধর্মবাদ, অন্যদিকে উগ্র বর্ণবাদ। এই প্রবণতা শুধু ইসরায়েলে নয়; গাজা ও পশ্চিম তীরেও লক্ষ্য করা গেছে। ২০০৮ সালের সংঘাতের পর থেকে দুই পক্ষ একে অপরের কাছ থেকে দূরে চলে গেছে, যদিও আগে তারা আলোচনায় বসেছিল। অনস্বীকার্য, দুই রাষ্ট্র তত্ত্বের বাস্তবায়নই সংকটের একমাত্র সমাধান- সন্দেহ নেই। কিন্তু সংকটের মূল না খুঁজে ক্ষমতাধর দেশগুলো শুধু যদি কৌশলী কারণে এই তত্ত্বকে চাপিয়ে দিতে চায় তাহলে আখেরে লাভ খুব একটা হবে না। কারণ এতে দুই জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের অবসান হবে না। বৃহৎ শক্তিগুলো যেভাবে ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে ইসরায়েলের পত্তন ঘটিয়েছিল; হয়তো একই অবিমৃষ্যকারিতার প্রকাশ ঘটবে। কাজেই দুই রাষ্ট্র তত্ত্বের যৌক্তিক বাস্তবায়ন জরুরি। ধর্মের প্রাধান্য না দিয়ে নিপীড়িত মানুষ বা মানবতার প্রাধান্য জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মহলকে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে যদি তারা প্রকৃতই শান্তিপ্রত্যাশী হয়।
আরও একটি বিষয় ভাবার আছে। অর্থবিত্ত ও সমরবিত্তে বলীয়ান ইসরায়েল গোটা আরব বিশ্বের বড় শক্তি। তার আছে সর্বাধিক প্রযুক্তি পরিচালিত বাহিনী সমন্বয়ে পারমাণবিক অস্ত্র। আছে দক্ষ অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বাহিনী, কৌশলগত ক্ষমতা, সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং ব্যাপক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক। এ পর্যন্ত যতটি যুদ্ধ হয়েছে তার প্রায় সবই সে কারণে হয়েছে একেবারে অসম। পাশাপাশি এটিও মানতে হবে, প্রযুক্তির আহরণ সময় ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। একটি সময় আসা তাই অমূলক নয়- ফিলিস্তিনিরা নিজেরাও উপযুক্ত সমরসম্ভারে সজ্জিত হতে পারবে।
জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলেছে। ইসরায়েল সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিশালী দেশগুলো এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। অতএব ইসরায়েল প্রথম থেকে যা করে আসছিল, সেভাবেই অগ্রসর হচ্ছে, যা ক্ষমতার অপব্যবহার।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। তাদের বিভিন্ন দল-গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব শক্তির একীভূত বিকাশ ঘটাতে দেয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আরবদের সম্মিলিত শক্তিও গড়ে ওঠেনি। মোদ্দা কথা, ফিলিস্তিনিরা মূলত লড়ছে অপমানের আবেগ দিয়ে। তাদের আছে বিশ্ববাসীর সমর্থন, যে বিশ্ববাসী আবার বিশ্বব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে- ২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের শেষে পশ্চিম তীরে বেকারত্বের হার ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ, গাজায় ৪৩ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরের আর্থিক পরিস্থিতি রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আরও খারাপ। অর্থনৈতিক মন্দা বেড়েছে। কভিড-১৯ সংকটের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। কারণ, ফিলিস্তিন অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৯৯ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছে; বিশেষত পর্যটন, রেস্তোরাঁ ও নির্মাণের মতো সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোতে।
এদিকে ইসরায়েল তার অর্থনৈতিক শক্তিকে সামরিক শক্তির মতোই কাজে লাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষদের মতে, ২০১৯ সালে ইসরায়েলের প্রকৃত জিডিপি ছিল ৩.৩৬৩ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ছিল ৩০ মিলিয়ন ডলারের নিচে। পশ্চিম তীর এবং গাজায় চাকরির বৈষম্য এবং ফিলিস্তিনের বেকারত্ব কম জটিল নয়। তাদের জীবিকার প্রয়োজন ব্যাপক। সহিংসতার কথা বলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তুলনামূলক খুবই সামান্য উদ্যোগী হয়েছে ইসরায়েল। অনস্বীকার্য, ইসরায়েলেও গভীর রাজনৈতিক বিভাজন আছে। তবে ফিলিস্তিনিদের দখলকৃত মাটি দখলে রাখার বিষয়টি প্রায় সর্বজনীন তত্ত্ব সেখানে।
ইসরায়েল একটি ক্ষুদ্র দেশ, যার জনসংখ্যাও ক্ষুদ্র। কিন্তু তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল সম্পদশালী এবং জনবহুল দেশকে তোয়াক্কা করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের রাজন্যশাসিত দেশগুলোতে যে জীবনধারা, তাতে ফিলিস্তিন নিয়ে তাদের খুব একটা ভাবার অবকাশ আছে, মনে করার কারণও নেই। ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান জরুরি; তবে সে সমাধান কোনো পক্ষেরই সামরিক সক্ষমতার বিজয় নয়। বিজয় হতে হবে মনুষ্যত্ব ও মানুষের সভ্যতাকে মর্যাদা দেওয়ার।
জোর করে আরবদের জমি দখল করে গঠিত হয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বাস্তবতা এই, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৬৭টি দেশ তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিসর, জর্ডান, আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কোসহ অনেক মুসলিম দেশ বিভিন্ন পর্যায়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে 'ইসরায়েল ছাড়া পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রে যাওয়া যাবে' বলে যে সিলটি মারা থাকত, তার পরিবর্তন ঘটেছে। তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যা এসেছে- এই পরিবর্তন শুধুই দেশের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান রক্ষার্থে। কারণ, বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে এবং সে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও তার নেই।
মনে রাখা উচিত, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট সার্বিক অর্থেই মানবতার সংকট বা মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে উৎসারিত। কাজেই একে মানব সভ্যতার বিপর্যয় হিসেবেই দেখতে হবে। যতদিন এই দেখা থেকে ক্ষমতাধর গণতান্ত্রিক দেশগুলো দূরে থাকবে, ততদিনই এ সংকট মানব সভ্যতাকে রক্তাক্ত করবে।

 কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও পর্যবেক্ষক