আবারও পানির দাম বাড়ানোয় ঢাকা ওয়াসার সিদ্ধান্ত আমাদের বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদটিই মনে করিয়ে দেয়- 'ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই'। জরুরি এই সেবা সংস্থার 'পারফরম্যান্স' নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে যে অসন্তোষ বছর বছর পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তা নিরসনের বদলে প্রতি বছর 'নিয়ম করে' পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? সমকালে বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, এ নিয়ে গত ১২ বছরে ১৫ দফায় বাড়ানো হলো পানির দাম। অস্বীকার করা যাবে না যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়ানোর এখতিয়ার ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের রয়েছে। তাই বলে করোনা মহামারির সময়ও সেই কাগুজে নিয়ম মেনে চলতে হবে? করোনার অভিঘাতে ঢাকায় বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিকের আয় কমে যাওয়া, এমনকি কর্মহীনতার চিত্র যখন স্পষ্ট; তখন ওয়াসার এমন সিদ্ধান্ত কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের মনে আছে, গত বছরও দুই দফায় যথাক্রমে ৫ ও ২৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল সংস্থাটি। কিন্তু সেই সমালোচনা থেকে ঢাকা ওয়াসা কোনো শিক্ষা যে গ্রহণ করেনি, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তার প্রমাণ।
আমরা আরও বিস্মিত হয়েছি, খোদ ওয়াসা বোর্ডের একাধিক সদস্য পরপর দুটি বৈঠকে দাম বৃদ্ধির প্রশ্নে আপত্তি জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। আমাদের প্রশ্ন- পানির দাম বৃদ্ধি কী এমন আপদকালীন ব্যবস্থা যে, 'ভার্চুয়াল' সভা ডেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে? সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এটা স্পষ্ট, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। দফায় দফায় দায়িত্বের মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধাই কি এই ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নাগরিকবৈরী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে তুলছে? এ ক্ষেত্রে 'মূল্যস্ম্ফীতি' সামাল দেওয়ার যে যুক্তি ঢাকা ওয়াসার পক্ষে দেখানো হচ্ছে, তা নেহাতই খোঁড়া। সরকার যেখানে সব সংস্থাকে ব্যয় সংকোচনের নির্দেশনা দিয়েছে, সেখানে ঢাকা ওয়াসার ব্যয়স্ম্ফীতি মেটানোর জন্য নাগরিকের কাঁধে বাড়তি বিল তুলে দেওয়ার প্রয়োজন কী? আমাদের মনে আছে, কয়েক মাস আগে রাজধানী ঢাকার খাল ও নালার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসার কাছ থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওপর অর্পিত হয়েছে। এর অর্থ হলো, সংস্থাটির ব্যয় আরও কমে যাওয়া। তারপরও পানির দাম বাড়াতে হবে কেন? করোনাকালে এভাবে দাম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসা স্পষ্টতই অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা মনে করি, অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।

ঢাকা ওয়াসার বরং নজর দেওয়া উচিত এদিকে যে, এই আপদকালে তার গ্রাহকদের কেউ যাতে পানির দাম পরিশোধে কোনো ভোগান্তির শিকার না হয়। প্রয়োজনে বিল বকেয়া রেখেও সেবা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা মনে করি, করোনাকালে নাগরিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য সংস্থাটি বরং দাম কমানোর উদ্যোগ নিতে পারত। তাহলে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতো। একই সঙ্গে সংস্থাটির সেবার মান নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোও নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চাই আমরা। প্রতি বছর ওয়াসার গ্রাহকসেবার মান 'কত শতাংশ' বাড়ছে- বোর্ড সভায় সে বিষয়টি আলোচনা হওয়া জরুরি। স্বীকার করতেই হবে, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ঢাকা ওয়াসা দেড় কোটি অধিবাসীর এই নগরে পানি সরবরাহ করার কঠিন কাজটি করে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা ছাড়াই দফায় দফায় পানির দাম বাড়িয়ে চলার প্রবণতা এবার যেন 'সীমা লঙ্ঘন' করেছে। বছর দুয়েক আগে আমরা দেখেছিলাম, ওয়াসায় 'সিস্টেম লস' কমাতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল 'বেসরকারি' খাতে। বাস্তবে সেই বেসরকারি ব্যবস্থাপনা বেনামে চালায় ওয়াসার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন। এর বিনিময়ে ইউনিয়ন আদায়কৃত রাজস্বের ১০ শতাংশ পায়। এই আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না যে, এই ছদ্ম 'বেসরকারি' উদ্যোগের সুবিধা করে দিতেই 'মূল্যস্ম্ফীতি' সামাল দিতে চাইছে গ্রাহকের কাছে বাড়তি বিল চাপিয়ে। অসন্তোষজনক সেবা, গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ এবং প্রতি বছর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের পোয়াবারোর এই কারবার আর চলতে দেওয়া যায় না।