মানব সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষার সংকট নতুন নয়। প্রায় দেড় বছর যাবৎ আমাদের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ। কভিড-১৯ শুধু বাংলাদেশ নয়; গোটা পৃথিবীর শিক্ষা কার্যক্রমকে স্থবির করে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, জুলাই ২০২১ থেকে আমরা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরতে যাচ্ছি। কিন্তু একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ২০২১ সালের পুরোটাই আমাদের চলে যাবে। আবার কভিডের যে গতি-প্রকৃতি, তাতে তৃতীয় ঢেউ যে আসবে না- তাও বলা যাবে না। অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে আগের মতো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষাক্রম থেকে ভিন্নতর কোনো না কোনো পদ্ধতিতে আমাদের যেতে হবে। সার্টিফিকেটকে মানদণ্ড ধরে যে মেধা যাচাই পদ্ধতি, তা থেকে বেরিয়ে বিকল্প কোনো পদ্ধতি সম্ভব কিনা, দেখা দরকার। প্রশ্ন হলো, কোন পথে আমরা এগোব?
গোটা পৃথিবীতে অনলাইনভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালানোর চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশেও হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা সুফল পাওয়া গেলেও সার্বিক অভিজ্ঞতা নেতিবাচক। মোদ্দা কথা, ফিরতে হবে ক্লাসরুমে। নিতে হবে পরীক্ষা। একটি মানদণ্ডের মূল্যায়ন তথা সার্টিফিকেট দিয়েই প্রজন্মকে যদি ছাড়তে হয়, সে ক্ষেত্রেও সহজ পথ বের করা দরকার।
প্রথমেই ভাবনায় আসে সিলেবাস কাটছাঁট করা কি যুক্তিযুক্ত হবে? আমার ছেলে যখন নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ত, তার বিজ্ঞানের বই দেখে স্তম্ভিত হয়েছি। এই মাত্রায় বিজ্ঞান আমাদের সময় বিএসসিতে পড়ানো হতো। শিশু-কিশোরদের মস্তিস্ক এভাবে ভারী করার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বরং এই মাথাভারী সিলেবাসের কুফল হলো গ্রামের দিককার ছেলেমেয়েদের ফল ভালো হয় না। বর্তমান মাথাভারী পাঠ্যসূচির কারণে আর কোনো জগদীশচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নজরুল ইসলাম, কুদরাত-এ-খুদা, শওকত ওসমান, ড. ইউনূস, রেহমান সোবহান, কবীর চৌধুরী, জামিলুর রেজা চৌধুরীদের জন্ম হয় না। প্রথমেই পাঠ্যসূচিকে হালকা করা চাই। সিলেবাসের অনেক কিছুই বাদ দিয়ে মেজাজ ফিরিয়ে আনতে হবে। সিলেবাস দেখে যেন শিশু-কিশোর বলে ওঠে, এ বই পড়তে বছর লাগবে না। মনের এই আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বেগ পেতে হবে না।
এর পরের ভাবনা হলো, শতভাগ টিকা না দিয়ে নতুন প্রজন্মকে ক্লাসরুমে ঢুকিয়ে দেওয়া বুমেরাং হবে না তো? দেড় বছর ধরে বাচ্চারা ঘরে বসে আছে। পরিস্থিতি যা-ই হোক, টিকা ছাড়া বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পক্ষে নই। তবে, বৈজ্ঞানিকভাবে যদি দেখা যায়, মোটামুটি হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে, তবেই প্রজন্মকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করার প্রশ্ন উঠবে; নচেৎ নয়।
একাত্তরে আমরা এক বছর পড়িনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের সব দেশে পাঁচ বছর পড়ালেখা বন্ধ ছিল। আব্রাহাম লিংকন তখন প্রেসিডেন্ট, দাসত্ব প্রশ্নে ১৮৬১-১৮৬৫ সময়ে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পাঁচ বছরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমেরিকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পাঁচ বছরকে হিসাবে নিয়েই ইউরোপ সব দিক থেকে আজ বিশ্বসেরা। একাত্তরের এক বছর অনেক কিছুই নিয়ে গেছে, তবুও আমরা ছুটে চলেছি অগ্রগতির পথে। আসলে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। চিন্তাভাবনা নিশ্চয়ই হচ্ছে, আরও হবে। পাঠ্যক্রমের শেষ কথা হলো, বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে। কভিড-১৯ মেনে নিয়ে এটা কীভাবে সম্ভব- এটিই সবচেয়ে কঠিন ভাবনা। কিছুদিন পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে- এ ভাবনার পরিবর্তে বরং পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হবে না- এটা ধরে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এ পর্যায়ে ১৮-৩০ বছরের যুবদের টিকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পথে এগোতে হবে।
জোর গলায় বলা যায়, ২০২২ সালের আগে প্রাইমারি ও হাই স্কুল খোলার সুযোগ নিতান্তই কম। জানুয়ারি ২০২২ থেকে ১৫ বছর অবধি শিশু-কিশোরদের টিকার আওতায় আনার জন্য রাষ্ট্রের সর্বশক্তি ব্যবহার করতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের জন্য টিকা কেনার সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। মনে রাখতে হবে, জীবনে সময়ের মূল্যও কিন্তু ফেলনা নয়। তেমনি ভ্যাকসিন ছাড়া ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোও উচিত হবে না।
আইনজীবী
spdey 2011@gmail.com