হালদায় এবার মা মাছ কম ডিম ছেড়েছে। কম বলা ঠিক হবে না। গত বছর 'বেশি' দেখানো হয়েছে। সে তুলনায় এবার ডিম 'কম' ছেড়েছে? কেউ কেউ লবণাক্ততাকে এর জন্য দায়ী করেছেন। কিন্তু অতীতে হালদার পানির লবণাক্ততা কখনও অস্বাভাবিক এমন কোনো পর্যায়ে উন্নীত হয়নি যে, কার্প জাতীয় মাছের ডিম ছাড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ডিম ছাড়ার অতি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন হয়। হালদা পানির প্রতিবেশের ভৌত-রাসায়নিক বিভিন্ন মানদণ্ড এবং প্রতিবেশ- পরিবেশের প্রাকৃতিক অবস্থার দ্বারা মাছের ডিম ছাড়া, ডিম প্রাপ্তি প্রভাবিত হয়। এবার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃষ্টি হয়নি। উজানে বৃষ্টির স্বাদু পানির প্রবাহের স্রোত, মেঘের কাঙ্ক্ষিত গর্জন, বাতাসের ঝাপটা প্রবাহ, পানির স্রোত এবং ঘূর্ণি, কার্প মাছের ডিম ছাড়তে প্রভাবিত করে। পানির বিওডি, পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন, খরতা, অম্লতা, পিএইচ, টারবিডিটি, বাতাস ও তাপমাত্রা এবং বাতাসের প্রবাহ, অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রাকৃতিক প্রভাব, জোয়ার-ভাটার মিথস্ট্ক্রিয়া, পানিতে দ্রবীভূত রাসায়নিক বিভিন্ন পদার্থের অতি অনুকূল অবস্থা- সবকিছু অতি অনুকূল থাকলে মাছ ডিম ছাড়ে।
গত ২৫ মে রাতে এবং ২৬ মে দুপুরে রাউজান ও হাটহাজারী অংশে ১২ থেকে ১৫টি স্থানে মা মাছ নমুনা ডিম ছাড়ে। প্রায় তিনশ পঞ্চাশ নৌকায় করে দুই দফায় ৩৫০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
কারও কারও ধারণা মতে হালদা গত ২০ বছরের ভেতর সবচেয়ে নিরাপদ ও ডিম ছাড়ার অনুকূলে আছে। কেউ কেউ প্রচুর মা মাছ বিচরণ করতেও দেখেছে। এসব কথার কথা, ভৌত অবস্থার কথা হতে পারে। কারণ প্রাকৃতিক প্যারামিটার, ঝড়-বৃষ্টি-স্রোত এবং মেঘের গর্জনের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই।
পানির জীব-বাস্তুতান্ত্রিকতা সংরক্ষণের জন্য প্রায় ২০ অথবা ২৫টি প্যারামিটার নির্দিষ্ট। যে নির্ভরতায় হালদার কার্প জাতের মা মাছ ডিম ছাড়ে। এসব প্যারামিটারের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড হালদার মাছের জন্য এখনও যথার্থভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। প্রজনন মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেশি বা কম ডিম পাওয়া গেলে ওই সময়ে পানির উল্লিখিত প্যারামিটারগুলোর মান নির্দিষ্ট করে অতি অনুকূল অবস্থা একটি চিত্র নির্দিষ্ট করে রাখা যেত ভবিষ্যতের জন্য। তাহলে আগত দিনগুলোতে মাছের প্রজনন মৌসুমে এই প্যারামিটারগুলোর মান যাচাই করে মাছের ডিমের বিষয়টিকে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা যেতে পারত। ধারণাটি সর্বজনীন হতো।
যারা বলেছেন লবণাক্ততার জন্য মাছ ডিম ছাড়েনি, তাদের আরও গভীরভাবে ভিত্তিমূলের গবেষণা করা দরকার। হালদার পানির লবণাক্ততা ৩৬.৯ পিপিটি কখনও ছিল না, হয়নি। কারণ সোজা, এত লবণাক্ততা সাগরের মধ্যখানের পানিতেও নেই। আর এ লবণাক্ততায় কার্প জাতীয় মাছের বেঁচে থাকার কথা নয়। উল্লেখিত সময়ে, গত কয়েক দিনে হালদায় কোনো ধরনের মৃত মাছ পাওয়া যায়নি। অধিকন্তু, নমুনা ডিম যাকে বলা হয়, তাও পানির এত বেশি লবণাক্ততায় পাওয়ার কথা নয়।

প্রাপ্ত ডিম বলে দেয়, হালদার লবণাক্ততা কথিত মাত্রায় ছিল না। মাতৃনদী কর্ণফুলীর মোহনা মুখ থেকে কালুরঘাটের ওপরে কর্ণফুলী-হালদার সংযোগস্থলের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। সাগরের পানি কর্ণফুলী হয়ে হালদামুখী গমনে মোহনা থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে লবণাক্ততা কমতে থাকে। হালদার লবণাক্ততা প্রভাবের সঙ্গে আরও দুটি অনুষঙ্গের সংযুক্তি থাকে। প্রথমত. কাপ্তাই বাঁধের খোলা গেটের মিঠাপানির প্রবাহ। দ্বিতীয়ত, হালদার ওপরের বৃষ্টিপাতের কারণে নিম্নমুখী মিঠাপানির প্রবাহ।
হালদা পানির কথিত লবণাক্ততা ৩৬.৯ পিপিটি অযৌক্তিক। এই লবণাক্ততা ধারণ করলে হালদার সব স্বাদুপানির মাছ মরে ভেসে উঠত। এ ছাড়াও এ রকম লবণাক্ততায় মা মাছ নমুনা ডিমও ছাড়তে পারে না। কার্প জাতের মাছের জল-বাস্তুতান্ত্রিকতা তা বলে না।
অতীতের গবেষণা থেকে জানা যায়, রুই-কাতলার ১৬ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের ছোট পোনা ৩.৩০ পিপিটি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ৮ পিপিটিতে এরা অস্থিরতা প্রদর্শন করে। ১০ পিপিটিতে মরে যায়। ২৭ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের পোনা ১০ পিপিটি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, তবে ৫০% মরে যায়। ১৩ পিপিটিতে এসব একটিও বেঁচে থাকে না। রুই-কাতলার সন্তোষজনক বৃদ্ধির জন্য পানির লবণাক্ততা ৫ পিপিটি অত্যন্ত উপাদেয়।
ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সামান্য বৃষ্টি হওয়া এবং বাতাসের প্রবাহ থাকায় তাপমাত্রা নিম্নমুখী ছিল কিছু সময়ের জন্য। তবে পানির স্রোত সৃষ্টি হয়নি। লাগাতার বৃষ্টি না হওয়া এর জন্য দায়ী। স্রোত না থাকায় পানিতে তীব্র ঘূর্ণন বা পাক সৃষ্টি হয়নি। এতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত ছিল না। লাগাতার বৃষ্টি না থাকায় উপরোক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। আগামী জুন মাসে কিছু ডিম পাওয়া যেতে পারে। আমাদের জানা রাখা দরকার, নদীর স্বাদুপানির লবণাক্ততা সাধারণত ০.৫ পিপিটি। মোহনার ঘোলা পানির লবণাক্ততা সাধারণত ০.৫-১৭ পিপিটি। সাগর- মহাসাগরের পানির লবণাক্ততা ৩২-৩৭ পিপিটি। মহাসাগরের পানির গড় লবণাক্ততা ৩৫.০ পিপিটি।
নদীর মোহনা-সাগরের সংযোগস্থলের পানির লবণাক্ততা কখনও কখনও ২০-৩০ পিপিটি হয়ে থাকে। তবে হালদার ডিম ছাড়ার জায়গাগুলোতে তা কখনোই ১০ পিপিটি ছাড়িয়ে যায়নি। এ মান অতিক্রম করলে হালদায় কার্প জাতীয় মাছের বিচরণ-আচরণ প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। মোহনার জল অত্যন্ত উর্বরতার প্রতীক এবং বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মোহনার জলের লবণাক্ততা পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তনশীলতাই মোহনা জলের বৈচিত্র্যের বাহন। ইয়াসের আবহে পানি এবং বাতাসের তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকায় মাছ মুহূর্তের জন্য অতি অনুকূল তাপমাত্রা পেয়েছিল। তাই সামান্য ডিম ছেড়েছে।
উপরে যথেষ্ট পরিমাণে বৃষ্টি হলে, কাপ্তাই বাঁধের আরও দু-একটি গেট খোলা থাকলে, তাপমাত্রার সহনশীল অবস্থা থাকলে, মেঘের গর্জন থাকলে, স্রোতের ঘূর্ণি থাকলে, পানি ঘোলা থাকলে আরও ডিম পাওয়া যেত। কোনো কোনো গবেষক অবশ্য মনে করেন, ভবিষ্যতে হালদার অববাহিকায় ব্যাপকভাবে গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন ঘটালে এবং পানি উত্তোলন বন্ধ করলে মা মাছ ডিম বেশি ছাড়বে।
হালদা সব ধরনের পরিবেশ-প্রতিবেশগত সংকট কাটিয়ে উঠুক, সবার সঙ্গে এই প্রত্যাশা আমাদেরও।
কর্ণফুলী গবেষক ও মুক্তিযোদ্ধা