কয়েক দফা ভূমিকম্পে শনি ও রোববার যেভাবে সিলেট নগরী কেঁপে উঠেছে, তাতে স্বভাবতই জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এ ভূমিকম্প দেশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে হওয়ায় আমরা মনে করি, এ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সমকালের খবর অনুযায়ী, শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চার দফা এবং রোববার ভোরে আরেক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের আগে এ রকম ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়ে থাকে। সেদিক থেকে প্রশাসনের সতর্কতার বিকল্প নেই। সিলেটে এরই মধ্যে সতর্কতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রোববার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ছয়টি মার্কেট ও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে এবং একটি বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আপাতত ১০ দিনের জন্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এমন নির্দেশ দিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন। আমরা দেখেছি, স্বয়ং সিটি করপোরেশনের মেয়র হ্যান্ডমাইকে সিলেট নগরীর সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বন্ধ রাখার নির্দেশ ঘোষণা করেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারি নদীর উজানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে, যা ডাউকি ফল্ট লাইনের পূর্বপ্রান্ত।

আমরা জানি, ডাউকি ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখার অবস্থ্থান সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তরে সীমান্তজুড়ে, যা ভারতের শিলং মালভূমির দক্ষিণ সীমানা। জানা যায়, ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্ট লাইনে ৮-এর বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হয়, যার তীব্রতা কলকাতা ছাড়িয়ে আরও পশ্চিমে এবং মিয়ানমার পর্যন্ত অনুভূত হয়। নতুন করে সিলেটের ভূমিকম্পে এটা স্পষ্ট, ডাউকি ফল্ট লাইনে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে সিলেট সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে যেসব পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে, তা যথার্থ হলেও পর্যাপ্ত নয়। যেহেতু ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাওয়ার ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি; সেহেতু এ দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জরুরি। বিভিন্ন দেশের উদাহরণে দেখা গেছে, ভূমিকম্প সংঘটনের প্রস্তুতিতে মানুষকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগের প্রস্তুতিতে ১০ শতাংশ মানুষকেও বাঁচানো সম্ভব হয় না। আমরা দেখেছি, এরই মধ্যে সিলেটের সব প্রশাসন, দপ্তর ও সেবা সংস্থাকে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আগামী সাত দিনের জন্য সিলেট সিটি করপোরেশনসহ সব জরুরি সেবা সংস্থা ও সহযোগী সব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প মোকাবিলায় জনসচেতনতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেটের ভূমিকম্প নিয়ে ভিত্তিহীন গুজবও তৈরি হয়েছে। সচেতনতা তৈরি না হলে যেমন গুজব ডালপালা গজাতে পারে; তেমনি ভূমিকম্পভীতির কারণেও আতঙ্কে মানুষ মারা যেতে পারে। আমরা মনে করি, সচেতনতা কিংবা সতর্কতা কেবল সিলেটের নয়; বরং ঢাকা শহরসহ পুরো দেশের জন্যই সতর্কতা প্রয়োজন। আমরা দেখি, যখনই ভূমিকম্প হয় তখনই শুধু ভূমিকম্পের ঝুঁকি আলোচনায় আসে। আমরা জানি, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার আগাম পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ। অথচ এ বিষয়টিতে আমাদের জাতীয় অবহেলা স্পষ্ট। এ বিষয়ে ২০০৬ সালে আইন হলেও তার অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই।

ঢাকাসহ বড় বড় শহরে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বড় ক্ষতির শঙ্কা থেকেই যাবে। আমরা চাই, সিলেটের কয়েক দফার ভূমিকম্প 'ওয়েকআপ কল' হিসেবে বিবেচনা করে দেশব্যাপীই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। সতর্ক না হলে একটি ভূমিকম্প কত বড় দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।