স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্টেম্নর স্বাধীন সোনার বাংলা। ৪ জুন দেশব্যাপী প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে 'জাতীয় চা দিবস'। দিনটি বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৫৭ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাঙালি হিসেবে চা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের চা শিল্প একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। যথাযথ নীতি সহায়তা ও সহযোগিতা পেলে চা শিল্প হয়ে উঠতে পারে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা অন্যতম শিল্প।
১৮০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতবর্ষের আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় চা চাষ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে জমি বরাদ্দ হয়। ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব-সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কুন্ডদের বাগান বলে পরিচিত ছিল। প্রতিষ্ঠার পর ওই চা বাগানটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতঃপর ১৮৫৭ সালে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডে দেশের সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান 'মালনিছড়া' প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলায় চা আবাদ করা হতো, যা যথাক্রমে সুরমা ভ্যালি এবং হালদা ভ্যালি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধায়ন ও প্রতিবেদনের সুবিধার্থে সিলেটের সুরমা ভ্যালিকে লস্করপুর, বালিশিরা, মনু, দলই, লংলা এবং নর্থ সিলেট নামে ছয়টি ভ্যালিতে ভাগ করা হয়েছে এবং হালদা ভ্যালিকে চট্টগ্রাম ভ্যালি নামকরণ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন ঢাকার মতিঝিলে সরকার কর্তৃক চা বোর্ডের প্রধান কার্যালয় নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত হয়। তিনি ১৯৫৭ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে টি রিসার্চ স্টেশনের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করে উচ্চফলনশীল জাতের (ক্লোন) চা গাছ উদ্ভাবনের নির্দেশনা প্রদান করেন। চায়ের উচ্চফলন নিশ্চিত করতে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানে উচ্চফলনশীল জাতের চারা রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু টি অ্যাক্ট-১৯৫০ সংশোধনের মাধ্যমে চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (সিপিএফ) চালু করেছিলেন, যা এখনও চলমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চা বাগানগুলো প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই শিল্পকে টেকসই খাতের ওপর দাঁড় করানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীনতার পর 'বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রিজ ম্যানেজমেন্ট কমিটি' গঠন করে যুদ্ধোত্তর মালিকানাবিহীন/পরিত্যক্ত চা বাগান পুনর্বাসন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ ছাড়া যুদ্ধে বিধ্বস্ত পরিত্যক্ত বাগানগুলোকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাগান মালিকদের কাছে ফের হস্তান্তর করেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত চা কারখানাগুলো পুনর্বাসনের জন্য 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া' থেকে ঋণ গ্রহণ করে চা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। চা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বঙ্গবন্ধু সরকার চা উৎপাদনকারীদের নগদ ভর্তুকি প্রদান করার পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহের ব্যবস্থা করেন, যা এখনও চলমান। তিনি চা শ্রমিকদের শ্রমকল্যাণ নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিনামূল্যে বাসস্থান, সুপেয় পানি, বেবিকেয়ার সেন্টার, প্রাথমিক শিক্ষা এবং রেশন প্রাপ্তি চালু করেন, যা এখনও চলমান। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ টি রিসার্চ স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটে উন্নীত করেন, যা বর্তমানে 'বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)' নামে পরিচিত।
বিশ্বে প্রায় ৩০টি দেশ চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, যাদের মোট উৎপাদনের শতকরা ৭০ শতাংশ ব্ল্যাক টি, ২৫ শতাংশ গ্রিন টি এবং বাকি ৫ শতাংশে অন্যান্য চা উৎপাদিত হয়। বিশ্বে চা উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম স্থানে, যেখানে চীন ও ভারত যথাক্রমে ১ ও ২নং স্থান দখল করে রয়েছে। দেশের চায়ের উৎপাদন গত ১০ বছরে প্রায় ৬০.০১ শতাংশ বা ৩৬.০৩ মিলিয়ন কেজি বৃদ্ধি পেলেও তার বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৫.১৯ শতাংশ বা ৩৭.৫৭ মিলিয়ন কেজি। দেশে প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে চা চাষাবাদ হয়, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার স্থায়ী শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। দেশের উৎপাদিত চা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা হচ্ছে, আবার চাহিদার ঘাটতি মেটাতে চা আমদানিও করা হচ্ছে। ১৯৭০ সালে চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩১.৩৮ মিলিয়ন কেজি। ২০২০ সালে রেকর্ড পরিমাণ ২.১৭ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি হয়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে চা আমদানির প্রয়োজন হবে না, বরং রপ্তানির ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে চা বাগানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫০টি, বর্তমানে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। এ ছাড়া চা বোর্ড কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন জেলায় ক্ষুদ্রায়তনে চা আবাদ শুরু হয়েছে এবং ব্যাপক সফলতা লাভ করেছে। বর্তমান সরকার চা শিল্পের উন্নয়নে 'উন্নয়নের পথনকশা :বাংলাদেশ চা শিল্প' শিরোনামে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের চা শিল্পের উন্নয়নে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ চা বোর্ড কাজ করে যাচ্ছে। চা শিল্পের গবেষণা কাজের জন্য বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট কাজ করে যাচ্ছে। উৎপাদিত চা নিলাম বাজারে বিক্রয়ে সহায়তার জন্য ১১টি ব্রোকার প্রতিষ্ঠান, ক্রয়-বিক্রয়ের সহযোগিতার জন্য টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদ, শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন, কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনসহ অর্থ জোগানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ওই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে।
চা শিল্প একটি প্রকৃতিনির্ভর ও শ্রমঘন শিল্প। প্রকৃতির বিরূপ আচরণে মুহূর্তের মধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতিতে পড়তে পারে এ শিল্পটি। এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে যা অত্যাবশ্যকীয়- ১. চা শিল্পের জন্য সার ও খাদ্যপণ্যের মতো ভর্তুকি মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ, কীটনাশক ও জ্বালানি দ্রব্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে; ২. প্রকৃতির বিরূপ আচরণের ফলে সংঘটিত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য জাতীয়ভাবে চা বীমা চালু করতে হবে; ৩. এ শিল্পের শ্রম নির্ভরশীলতা হ্রাসকরণের এবং পণ্যের বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে আধুনিক চাষাবাদ, প্রক্রিয়াকরণ ও যন্ত্রপাতির ব্যয় মেটানোর জন্য বিনা সুদে একটি আলাদা উন্নয়ন স্কিমের আওতায় চা উন্নয়ন তহবিল বরাদ্দ করতে হবে; ৪. চা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও তার অংশবিশেষ আমদানিতে শূন্য হারে শুল্ক্ক প্রদান করতে হবে। এখন থেকে উপরোক্ত প্রস্তাবিত উন্নয়ন স্কিমের আওতায় চা শিল্প আধুনিকায়ন হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ প্রদান করতে হবে; ৫. চা শিল্পের উৎপাদন ও উন্নয়ন ঋণের সুদের হার বর্তমানের ৯ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড