আমাদের দেশের পাসপোর্টে দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান ও ইসরায়েলের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বাংলাদেশ সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। পরে তাইওয়ানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয় পাসপোর্ট থেকে। তাইওয়ানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে চীন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে, বিএনপি সরকারের আমলে তাইওয়ানে দূতাবাস খোলাকে কেন্দ্র করে চীন আপত্তি জানিয়েছিল। তাইওয়ানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও দেশটিকে এখনও স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ। কারণ আমরা চীনা পলিসিতে বিশ্বাসী।
সম্প্রতি পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কের শুরু হয়েছে ইসরায়েলের অফিসিয়াল টুইটবার্তার পর। পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে ছয় মাস আগে। অথচ তা প্রকাশ পেয়েছে অনেক পরে। সাম্প্রতিককালে ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বর আক্রমণের ফলে ইসরায়েল বিশ্বে অনেকাংশে একঘরে হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় পাসপোর্ট ইস্যুটি বড় করে সামনে এনে ইসরায়েল দেখাতে চেয়েছে, বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে আছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি পরিস্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, আরববিশ্বের কয়েকটি দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা জানি, বাংলাদেশ বহু বছর ধরে আইনিভাবে প্যালেস্টাইন মিশন পরিচালনা করছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় পাসপোর্ট থেকে 'অ্যাকসেপ্ট ইসরায়েল' তুলে দেওয়া বড় কোনো ঘটনা নয় বলে আমি মনে করি।
ইসরায়েল এবং সে দেশের জনগণের বিষয়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আপত্তির বিষয় আছে। পাসপোর্ট ইস্যুতে সরকারের দায়িত্বশীলরা একাধিকবার কথা বলেছেন। আমরা এও দেখেছি, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে পরিস্কার ভাষায় নিজের অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যা অনেক দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানই করেননি। তবে, কোনো সন্দেহ নেই- বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেকেই রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাইবেন। কারণ, প্রসঙ্গটি এমন সময়ে উঠে এসেছে, যখন ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর আগ্রাসন চালাচ্ছিল। সরকারের উচিত ছিল ছয় মাস আগেই বিষয়টি খোলাখুলিভাবে জানিয়ে দেওয়া। সরকার স্পষ্ট করে এখনই বলতে পারত ইসরায়েলকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে ইসরায়েল এ বিষয়ে এ ধরনের কোনো প্রচারণা চালাতে পারত না।
অবশ্য আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জানিয়েছে, পাসপোর্ট ইস্যু প্যালেস্টাইনের ব্যাপারে বাংলাদেশের পলিসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আর এই সময়ে বাংলাদেশের পলিসি পরিবর্তন হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন আবার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক- এমনটি অনেকেরই আছে। হয়তো বাংলাদেশও তা-ই করেছে। ইসরায়েল ইতোমধ্যে একঘরে হয়ে পড়েছে। আরববিশ্বের কয়েকটি দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনে নিন্দিত হচ্ছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত থামাতে বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্র ফর্মুলার কথা অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। বাংলাদেশ কখনও বলেনি, ইসরায়েল নামে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। আবার দুই রাষ্ট্র প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছে। সেখানে দ্রুত দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা সবার জন্যই মঙ্গলজনক।
ইসরায়েল সংকট আরববিশ্বের মাধ্যমে সৃষ্ট নয়। পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যর্থতা ও একগুঁয়েমির কারণে এই সংকটের শুরু। ইহুদিরা খ্রিষ্টানদের সঙ্গে ইউরোপে থাকতে পারছিল না। এ জন্য তারা আলাদাভাবে থাকার জন্য একাধিক জায়গা খোঁজার চিন্তা করেছিল। আলাদা থাকতে চাওয়া ও নতুন রাষ্ট্রের ভাবনার ফলে হিটলার ইহুদি নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠেন এবং তাদের ছয় মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করেন। এ সংকট ইউরোপিয়ানদের দ্বারা সৃষ্ট। তারা এর সমাধান করতে চাচ্ছে না বলে সংঘাতও থামছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ সংঘাত চলাকালে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে একটা গোষ্ঠী এ সংঘাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর ছিল। তারা নেতানিয়াহুর গণহত্যার বিরোধিতা করেছে। ইসরায়েলের জনগণ যত বেশি এই সংঘাতের বিরোধিতা করবে এবং দুই রাষ্ট্রের প্রস্তাবনা মেনে নেবে, তত দ্রুতই এর সমাধান আসবে। ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যেও প্রতিবাদের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেছে। এর ফলে ইসরায়েলপন্থি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাধ্য হয়েছেন যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে। এ ছাড়া, ইউরোপের পথে পথেও এবার বিক্ষোভ দেখা গেছে। ইউরোপিয়ানরা এ বিষয়ে সোচ্চার হলে দুই রাষ্ট্রের ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব।

১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট বিরাজ করছে। ইসরায়েলের নীতি হলো- পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের ইহুদিরা দেশটির নাগরিকত্ব পাবে। কিন্তু সেখানে যারা হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তারা নাগরিকত্ব পাবে না! এটা এক ধরনের উপনিবেশ ব্যবস্থা। আমি মনে করি, ইসরায়েলের এ নীতি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার শেষ উদাহরণ। ইসরায়েল নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। আমরা জানি, ইহুদি জনসংখ্যা কমে আসছে। আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যে হয়তো ইহুদিরা ইসরায়েলেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। সেই জায়গায় তাদের ভয় রয়েছে। এর জন্য তারা ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন করতে চেয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, যাতে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়।
বিগত সময়ে ইসরায়েলি বর্বরতার বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসী দেখতে পায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়া সংঘাতের দায় চাপিয়েছে ফিলিস্তিনিদের ওপর। কিন্তু এবারের বর্বরতার বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসী দেখেছে প্রযুক্তির কারণে। মানুষ সেখানকার প্রকৃত চিত্র দেখেছে বিভিন্ন লাইভ ফুটেজে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে, এই সংঘাতে দায়ী কারা। কারা আসলে গণহত্যা চালাচ্ছে। ফলে আগামী দিনে ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি ইসরায়েলের ভেতরেও এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, এমন সম্ভাবনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর আলামত এখনই অনেকটা স্পষ্ট। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় এমন নৃশংসতার দীর্ঘস্থায়ী রূপলাভ কঠিন।
বাংলাদেশ সবসময়ই ফিলিস্তিনিদের পাশে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চিকিৎসা সামগ্রী পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের এদেশে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছে। এখন যদি আমরা গাজা এবং পশ্চিমতীরের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারি, সেটিও ভালো হবে। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাতে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়কাল থেকে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, সেই সম্পর্কে আরও গুরুত্বারোপ করা হলে পাসপোর্ট বিতর্ক পরিস্কার হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি থাকবে না।

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়