সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের শিকার নারী কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। একটি পাবলিক প্রতিষ্ঠানে তার জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার ভোগ করার কথা। কিন্তু তা নৃশংসভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। এর জন্য দায়ী কলেজ কর্তৃপক্ষের নিষ্ফ্ক্রিয়তা, অবহেলা। আদালতের এই মন্তব্যের ভিত্তি দেশের সংবিধান।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, ৩৬ অনুচ্ছেদে চলাফেরায় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আর আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে ২৭ অনুচ্ছেদে। রাষ্ট্রের কোনো যন্ত্রের অবহেলা বা নিষ্ফ্ক্রিয়তায় এ ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার তাই সংবিধানই দিয়েছে। ১০২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভুক্তভোগী যথাযথ প্রতিকার পেতে পারেন। তাই আদালতের নিদান, অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে নারীরা সব ধরনের নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে দেশকে অনন্য উচ্চতায় এগিয়ে নিতে পারবেন।

গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্বামীকে আটকে রেখে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা দেশমাতৃকার বুকে আঘাত হয়ে বেজেছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওই পৈশাচিক আচরণে আহত হয়েছে দেশের আপামর সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ভুক্তভোগী তরুণীর বেদনা, অপমান, ক্ষত কোনোভাবেই মুছে যাওয়ার হয়তো নয়, তবু তার নরক গুলজার যে তার একার নয়, এ বার্তা নিয়ে মানুষ পথে নেমেছে। দেশবাসীর এই সহমর্মিতা তাকে ও তার পরিবারকে একটু হলেও হয়তো ছুঁয়ে থাকবে; ন্যায়বিচার পাওয়ার ভরসা জোগাবে। অন্যদিকে গণমানুষের সংক্ষুব্ধতা, ধিক্কারে টনক কিছুটা নড়ে কর্তৃপক্ষেরও। তাই তাড়াতাড়িই ধরা পড়ে অভিযুক্ত আট ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তারা সবাই এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে।

করোনায় বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকিতে পড়েছে। অকাল মৃত্যুর লাগাতার খতিয়ান, স্বজন হারানো মানুষের অথৈ বেদনা, সঙ্গে জীবনের ঘোর অনিশ্চয়তা। এমন দুঃসময়কেও 'সুসময়' বানিয়ে নেওয়ার কায়দাকানুন কি দুর্বৃত্তদের একার, নাকি তাদের দুর্বৃত্তায়নের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি কোনো 'কর্তৃপক্ষ' দ্বারা? করোনায় দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এমসি কলেজও বন্ধ। এরপরও কয়েকজন প্রাক্তনসহ বর্তমান ছাত্র কলেজ হোস্টেলে দিব্যি রাজত্ব বিছিয়ে ছিল। তাদের একজন আবার ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাসভবন দখল করে থাকে। এ জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি। অর্থাৎ ধরাকে সরা জ্ঞান করার মতো যথেষ্ট 'কারণ' বিদ্যমান। এ কারণে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করতেও তাদের এতটুকু বুক কাঁপেনি! বিচারিক অনুসন্ধানেই এ কথার প্রমাণ মিলেছে। এ ঘটনায় তাই ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে অবহেলা দায়ী। আর প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কলেজের অধ্যক্ষের ওপরও এর দায়ভার চলে আসে।

তরুণীর ওপর যারা হামলে পড়েছিল তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট জীব আর নেই। কিন্তু এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার উপায় নেই; কেননা নিকৃষ্ট জীবগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য নয় এবং এটিই প্রথম কোনো ঘটনাও নয়। 'ঝুঁকিপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রেই এই করিলে সেই হইবে অতএব কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়' সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়ার বহু নজির আছে। কিন্তু আরও অনেক ক্ষেত্রে তেমন দায়সারা বার্তাও ঝোলে না, কিন্তু সেখানে ওত পেতে আছে বিবিধ বিপদ। এমসি কলেজও তেমন এক সতর্কবার্তাহীন 'বিপদ-ভবন' হয়েছিল। এভাবে আর কতশত 'বিপদ-ভবন' যে সারাদেশে ছড়িয়ে আছে! দেশের সব ধরনের সব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিকার অর্থেই দায়িত্বশীল হতো, তাহলে আর সতর্কবার্তা ঝোলানোর দরকার পড়ত না, না-লেখা সতর্কবার্তাও হয়ে উঠত না আরও বেশি ভয়ানক। আদালতকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না 'কর্তৃপক্ষ তুমি দায়ী'; এমন দিন কবে আসবে?

সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com

বিষয় : অন্যদৃষ্টি হাসান ইমাম

মন্তব্য করুন