সম্প্রতি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে সফরকালে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতসহ অন্য কূটনীতিকরা বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। রাষ্ট্রদূতদের ওই সফরে আরও উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুয়ার এবং জাপানের রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতো। কূটনীতিকদের এই আশ্বাসবাণীর পর সেই কক্সবাজারেই জীর্ণ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসে হুবহু একই কথা বলেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ভলকান বজকির। দীর্ঘদেহী ও শুভ্রকেশী এই তুর্কি কূটনীতিক বলেন, 'বিশ্ব এখনও ভোলেনি রোহিঙ্গাদের। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও মনে রেখেছে রোহিঙ্গাদের কথা।' এর আগে ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে সফরে আসেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনীতিকদের এমন জোর দিয়ে 'রোহিঙ্গাদের ভুলে না যাওয়ার' বক্তব্যের মধ্যে ইতিবাচক বার্তার প্রতিফলন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা। ভবিষ্যতে জাতিসংঘসহ দাতা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সাহায্য প্রদানে অধিক আগ্রহী হবেন- সেই ইঙ্গিত বহন করছে তাদের সাম্প্রতিক বার্তায়। তবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান, খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের সংস্থানের পাশাপাশি জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মিয়ানমারে টেকসই প্রত্যাবসন নিশ্চিতকরণে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের নজর দেওয়া জরুরি।
গত ৩১ মে নোয়াখালীর ভাসানচরে মাসে পাঁচ হাজার টাকা মাসোহারা, উন্নতমানের রেশনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিদের সামনে ১৮ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে ৫০০-৬০০ রোহিঙ্গা বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। আপাতদৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের এই ক্ষোভ রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সংস্থাগুলোর প্রতি হলেও দিন শেষে এর দায় জাতিসংঘসহ দাতা সংস্থাগুলোর ওপর বর্তায়। গত ডিসেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের উন্নত বাসস্থান ও জীবনধারণের জন্য ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হয়। জাতিসংঘসহ এই এনজিওগুলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে বাংলাদেশ সরকার নানাভাবে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু নানা অজুহাতে তারা ভাসানচরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় অপরাগতা প্রকাশ করেছে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির বিশ্বের শরণার্থী শিবিরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি ক্যাম্পগুলোতে স্থান সংকুলান ও নূ্যনতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে শুরু থেকেই হিমশিম খেতে হয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি ও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোকে। পাহাড়ের পর পাহাড় আর বনের পর বন উজাড় হলেও প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪০ থেকে ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়েছে। বিপুল পরিমাণ আশ্রয়প্রার্থীর ভার সামলাতে কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থা। ফলে একদিকে দেখা দেয় আশ্রয়প্রার্থীদের ভার বহনে প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি; অন্যদিকে মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন দুস্কৃতকারী গোষ্ঠীর স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় টেকনাফ, উখিয়া, কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো। এর প্রেক্ষাপটেই কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে সাময়িকভাবে স্থানান্তরের জন্য ২০১৭ সালের নভেম্বরে অনুমোদন পায় ভাসানচরের আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প।
রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের নেওয়া এই স্বাধীন সিদ্ধান্তকে শুরু থেকেই ভালোভাবে নেয়নি বৈশ্বিক গোষ্ঠীগুলোর একটি পক্ষ। কোনো অনুদান বা ঋণ সহায়তা ছাড়াই প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার নিজস্ব অর্থায়নে ১২০টি গুচ্ছগ্রাম গড়ে তুলে ভাসানচরকে নতুন রূপ দেওয়া হয়। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শরণার্থী অবস্থান করছে, সেসব দেশেও কোনো জায়গায় শরণার্থীদের জন্য ভাসানচরের মতো এমন অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুবিধা গড়ে তোলা হয়নি। অথচ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জীবন আরও উন্নত করার পরিবর্তে ও তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে বিমূর্ত সব দাবি তুলে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে চাহিদার বিপরীতে ২০১৭ সালে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৭ শতাংশ, যা ২০২১ সালে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ৮৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভাসানচর ইস্যুকে প্রথম থেকেই 'প্রেস্টিজ ইস্যু'তে পরিণত না করে ১১ লাখ রোহিঙ্গার নিঃশর্ত আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের সঙ্গে প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে সহায়তার সম্পর্ক গড়ে তুললে দৃশ্যপট আজ অন্যরকম হতো, স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের ক্রোধের এই সহিংস বহিঃপ্রকাশও আর দেখতে হতো না। ভাসানচরে রোহিঙ্গা বিক্ষোভে মানসম্মত রেশনের দাবি উঠে এলেও এই দ্বীপে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের তুলনায় পরিমাণে বেশি রেশন পায়।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের অবস্থান পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহেই বাংলাদেশ সফররত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ভলকান বজকির বলেন, '(ভাসানচরে) মানসম্মত ভবন নির্মাণের প্রশংসা আমি করি। হারিকেন ও দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পদক্ষেপ সেখানে নেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় এটা বিশ্বের জন্য উদাহরণ হতে পারে।' এর আগে ভাসানচরের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ওআইসির প্রতিনিধি দল। এ ছাড়া চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত ১০ দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা ভাসানচর সফরে যান, যা বেশ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। তার এক মাস আগে মার্চে জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধি দল টানা তিন দিনের সফরে ভাসানচর অবস্থান করে এবং অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয়দের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময় শেষে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নূ্যনতম অগ্রগতি হয়নি। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার প্রশ্নে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সম্পৃক্ত হওয়ার আভাস সত্যিকার অর্থেই মিয়ানমারে নির্যাতিত বাস্তুচ্যুত এই রোহিঙ্গাদের আশান্ব্বিত করবে। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের উন্নত বাসস্থান স্থাপনে বাংলাদেশ যেমন অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছে, তেমনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো ভাসানচরেও মানবিক সহায়তা প্রদান করে জাতিসংঘ এ অঞ্চলে রোল মডেল স্থাপন করতে পারে।
উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক