বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ, যাদের বয়স ১৫-৩০ বছর। এক প্রতিবেদনে দেখেছি তরুণ কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে উচ্চ ডিগ্রিধারী তরুণরা হচ্ছে অর্ধেক, যা আঁতকে ওঠার মতো। অবশ্য করোনা মহামারির কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যে কারণে এ সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। উন্নত দেশ কিংবা অনুন্নত দেশ যা-ই বলি না কেন প্রতিটি দেশেই কম-বেশি কর্মহীন লোক রয়েছে। ক্ষুদ্র দেশে অধিক জনবলকে দায়ী করে আমরা যে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি, তা পুরোপুরি মানতে আমি নারাজ। বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে হয়তো অনেকের কাছে পরিস্কার হতে পারে।
দেশে বর্তমানে ৪৯টি সরকারি, ১০৭টি বেসরকারি ও তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে অনেক কলেজ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন আছে ৪৭ হাজার, জাতীয় ও উন্মুক্ত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয় মিলে রয়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার। প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থী প্রায় তেরো লাখ। সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ভর্তির নূ্যনতম যোগ্যতা হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ২.৫। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কলেজগুলোতে স্নাতক (অনার্স) এ ভর্তির নূ্যনতম যোগ্যতা হচ্ছে জিপিএ ২, স্নাতকে (পাস কোর্স) ভর্তি হতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কোনোভাবে পাস করলেই হয়। পৃথিবীর কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এত কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীকে উচ্চ ডিগ্রিধারী করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়? দেখা যাচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক পাস করা সব শিক্ষার্থীই আজ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কলেজগুলোতে পড়ছেন। কেন তৈরি হয়েছে এ কালচার? অভিভাবকরা কম যোগ্যতাসম্পন্ন সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে কেন এত মরিয়া? বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছাড়া তাদের জন্য বিকল্প কোনো পথ নেই? উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা নিজের পছন্দের বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ক্যারিয়ার গঠন করলে কি সফল হওয়া বা মর্যাদা পাওয়া যাবে না? তাহলে উচ্চ শিক্ষাটি কি শুধুই সামাজিক মর্যাদার জন্য? ক্যারিয়ার গঠন কি কোনো মুখ্য বিষয় নয়?
উচ্চ শিক্ষার অবাধ সুযোগ থাকার ফলে কম মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা আমলা হবে, বড় অফিসার হবে- এ স্বপ্টেম্ন বিভোরে থেকে অনেকে জীবনের শেষ সহায় সম্বলটুকু কাজে লাগিয়ে ঝুঁকির প্রতিযোগিতায় নামছে। পদের অভাবে এবং মেধাবীর ভিড়ে তাদের স্বপ্টম্ন পরিশেষে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তারা না পারছে প্রতিযোগিতায় টিকতে, না পারছে তাদের ডিগ্রির সমতুল্য সম্মানজনক কোনো পেশা বেছে নিতে। তারা কোনো রকমে কারিগরি ডিগ্রিধারীদের সঙ্গে সমতুল্য বেতনে এবং সমপদমর্যাদায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাহলে তারা যদি যথাযথ পেশার সুযোগ এবং মর্যাদা না পায়, বিদেশে তো এ ধরনের উচ্চ ডিগ্রিধারীর চাহিদা নেই। তারা কি পরিশেষে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে না? কারিগরি শিক্ষা থাকলে কি সবাই চাকরি পাবে? এ পেশায় সম্মানই বা কতটুকু? সেন্টার ফর এডুকেশন রিসার্চের তথ্য মতে জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তাদের মোট শিক্ষার্থীর ৭৩ শতাংশ, জাপানে ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ ও মালয়েশিয়ায় ৪৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে মাত্র ১৪ শতাংশ। আবার এ বিষয়ে রয়েছে মানহীন কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে বিস্তর অভিযোগ। নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষক, অবকাঠামো, ল্যাব, উপযুক্ত কারিকুলাম ও দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত কর্মসূচি। দেশে যদি ৫০ শতাংশ মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রদান করতে হয়, তাহলে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে? আমরা বর্তমানে যে পরিমাণ কর্মক্ষম যুবসমাজ নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছি, ২০৪১ সালে সেই সুবিধাটুকু একেবারেই থাকবে না। গত বছরের ৭ আগস্ট কারিগরি শিক্ষাবিষয়ক এক সেমিনারে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেককেই কারিগরি শিক্ষায় যেতে হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব গড়ার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত দেশ নির্মাণের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে। শুধু পুথিগতভাবে কারিগরি বিদ্যা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত কর্মসূচি থাকতে হবে। সময় আসছে- সার্টিফিকেট কিংবা কোথা থেকে পাস করেছে তা আর কোনো প্রার্থীকে নিয়োগকর্তা জিজ্ঞাসা করবেন না। জিজ্ঞাসা করবেন কোন বিষয়ে দক্ষতা রয়েছে। কারিগরি ও দক্ষতা জ্ঞানসম্পন্ন লোকবলের চাহিদা দেশেও আছে, বিদেশে তো গগনচুম্বী।
কারিগরি ক্ষেত্রটিকে মানসম্মত ও উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে সরকারের একার পক্ষে করা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় কোম্পানির মালিকরা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে অত্যন্ত আগ্রহী; কিন্তু দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল তৈরিতে আগ্রহী নয় বলে আমার মনে হচ্ছে। কারণ, তাতে হয়তো কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসবে না; কিন্তু ঝুঁকি তো কম। আর সব ক্ষেত্রে অতি মুনাফার কথা বিবেচনা করলে কী হয়? দেশের যুবসমাজকে কাজে লাগানোর বিষয়টা ভেবে দেখা জরুরি! সরকার তাদের একটি নীতিমালার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ কিংবা বিনিয়োগের ওপর কর অবকাশের মাধ্যমে কারিগরি প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্য আহ্বান জানাতে পারে। সময় এসেছে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষায় চাহিদাহীন বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে যুগোপযোগী বিষয়গুলোকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা, উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ও দেশি-বিদেশি অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পকারখানা বাড়ানো।
অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষক ও লেখক
msislam@du.ac.bd