সাংবাদিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রসঙ্গে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে 'অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩'। সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে দাবি উঠেছে এই আইন খারিজ করতে হবে। এটা যদি যুক্তি হয়, আরও অনেক আইনের মতো বাংলাদেশ দণ্ডবিধিকেও খারিজ করতে হয়, কারণ এটি প্রণীত হয়েছিল ১৮৬০ সালে। কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন এবং কিছু বিশেষায়িত আইন তৈরি হলেও আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু এই 'ঔপনিবেশিক' আইনের ওপরেই।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের এক ধরনের ধারণা আছে- ব্রিটিশরা বুঝি তার ঔপনিবেশিক শাসন নিশ্চিত করার জন্যই সব ভয়ংকর আইন তৈরি করে আমাদের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছিল। এটা ভুল ধারণা। ব্রিটিশ কলোনি ভারতে ১৯২৩ সালে এই আইনটি কার্যকর করার আগে ১৮৮৯ সালে খোদ ব্রিটেনেই এই আইন তৈরি হয়ে কার্যকর হয়েছিল, যা মোটামুটি আমাদের এখানকার আইনটির মতোই ছিল। আমরা অনেকেই অবাক হবো জানলে ব্রিটেনে এই আইনটি এখনও আছে। পার্থক্য হচ্ছে ব্রিটেন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে চারবার সংশোধন করেছে ১৯১১, ১৯২০, ১৯৩৯ এবং সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে। একটা আইন একশ বছর ধরে একই জায়গায় থেকে যেতে পারে না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা এখনও ১০০ বছরের পুরোনো আইনে মামলা করছি, যেটা কখনোই সংশোধিত হয়নি।
একটা রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে, রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর, রাষ্ট্রীয় অঙ্গের বাইরের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং নাগরিকদের চৌহদ্দি কতটুকু হবে- এগুলো কখনও স্থির বিষয় ছিল না আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার শুরু থেকেই। এগুলো নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তো বটেই, নাগরিকদের মধ্যেও। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার তথ্যের গোপনীয়তা কতটুকু রাখতে পারবে সেটি নিয়ে সব সময়ই বিতর্ক চলেছে। বিশেষ করে এই শতাব্দীর শুরুতে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সংক্রান্ত আলোচনা খুব গুরুত্ব দিয়ে পৃথিবীব্যাপী হয়েছে।
ব্র্যাডলি (পরবর্তীকালে লিঙ্গ পরিবর্তন করে 'চেলসি') ম্যানিং, এডওয়ার্ড স্নোডেন, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জদের মতো হুইসেল ব্লোয়াররা হিরো না ভিলেন সেই তর্ক শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আমেরিকার ক্ষমতাসীনরা যখন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল, ঠিক তখনই এই পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষের কাছে নায়ক হয়ে ওঠেন এসব মানুষ। যে আমেরিকার অতি গোপনীয় নথি প্রকাশ করার সঙ্গে জড়িত এসব মানুষ, সেই আমেরিকার নাগরিকরাও এদের ভিলেন বানায়নি। তাদের কাছেও এই ব্যক্তিরা পেয়েছেন বীরের মর্যাদা।
রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি তৈরি হয়ে থাকে মানুষকে মাথায় রেখে, তাহলে মানুষের চাহিদাকে রাষ্ট্রের মেনে নিতে হয়। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ব্রিটেনে কেন এতবার সংশোধিত হয়েছে সেটির বড় কারণ এখানে। তথ্য অধিকার আইন প্রায় সব দেশে এখন একটা বাস্তবতা। এছাড়াও তথ্য প্রকাশকে উৎসাহিত করার জন্য ও তথ্য প্রকাশকারীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে হুইসেল ব্লোয়ার্স প্রটেকশন অ্যাক্ট। আমাদের দেশেও কাগজে-কলমে এই ধরনের একটি আইন আছে যার নাম 'জনস্বার্থ সংশ্নিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১'। কাগজে-কলমে বলছি এই কারণে যে, কোনো তথ্য প্রকাশকারীকে শুধু সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্য প্রকাশের অপশন দেওয়া হয়েছে, অন্য কোথাও প্রকাশের ক্ষেত্রে নয়। সে কারণে এ আইনটি আদৌ কোনো অর্থবহ আইন নয়।
বস্তুত 'অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট' নিয়ে বিতর্কেরও মূল যুক্তি এটা হওয়া উচিত না যে, এটা ঔপনিবেশিক আইন। এমনকি এমন একটা আইন এটা সংশোধিত হলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হতে পারে না। কারণ আমরা এমন সময়ে বাস করছি যখন সারা পৃথিবীতেই অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এটা স্বীকার করছে, তথ্যপ্রাপ্তি নাগরিকদের একটা অধিকার। তাই তথ্য প্রকাশে বাধা হওয়া দূরে থাকুক তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য সব রকম পদক্ষেপ নেবে রাষ্ট্র।
তথ্যপ্রবাহে বাধা দেওয়া কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের কাজে লাগলেও জনগণের কল্যাণে আসে না। দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিখ্যাত গবেষণায় অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন পৃথিবীর কোনো দুর্ভিক্ষ খাদ্য ঘাটতির কারণে হয়নি, বরং হয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে। তিনি এটাও বলেছেন, গণতন্ত্র এবং মুক্ত সংবাদমাধ্যম আছে এমন কোনো দেশে কখনও দুর্ভিক্ষ হয় না। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে- যখন দুর্ভিক্ষ লেগে যায়, তখন মানুষের অভুক্ত থাকার কথা এবং দুর্দশার কথা সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকলে সরকার চাপে পড়ে। সেই চাপে পড়ে হলেও সরকার সেটিকে নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে বাধ্য হয়।
এটা বিশ্বজুড়ে আজ স্বীকৃত, যেখানে তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা থাকে সেখানেই আসলে কোনো না কোনো অপরাধ, অনিয়মকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা আছে। যে কোনো সংকটের সময় তো বটেই, এটা প্রযোজ্য যে কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও। এ কারণেই সংবাদমাধ্যম স্বীকৃত হয়েছে একটা রাষ্ট্রের অলিখিত চতুর্থবারের স্তম্ভ হিসেবে।
সাংবাদিকের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনের প্রস্তাবনাটি আমরা সবাই মাথায় রাখলেই বুঝে যাব সাংবাদিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়ার কথা। এতে বলা হয়েছে- 'যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতা নাগরিকগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং তথ্য প্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ; এবং যেহেতু জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক; এবং যেহেতু জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাইবে, দুর্নীতি হ্রাস পাইবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হইবে; এবং যেহেতু সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।'
শিক্ষক ও নাগরিক অধিকার কর্মী

মন্তব্য করুন