ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরোতে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে 'বিশ্ব সমুদ্র দিবস' পালন বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এর পর ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে গৃহীত ১১১ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে দ্য ওশান প্রজেক্ট এবং ওয়ার্ল্ড ওশান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি বছর ৮ জুন আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। মূলত ২০০৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৮ জুন 'বিশ্ব সমুদ্র দিবস' হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি ঘিরে সমুদ্রের অবদান, আবেদন, প্রয়োজনীয়তা আর উপকারিতাকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের সবার সামনে তুলে ধরা হয়। দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, সাগর-মহাসাগর সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি। এবারের আন্তর্জাতিক সমুদ্র দিবসের প্রতিপাদ্য 'জীবন ও জীবিকা'।
বর্তমানে যে সুনীল অর্থনীতি বা সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বলা হয়, এর উপলব্ধির ক্ষেত্রে বিশ্ব সমুদ্র দিবস বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আমরা দেখেছি, এ দিবসটি যেসব দেশে পালিত হয়, সেসব দেশের জনসাধারণ সমুদ্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে। সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তারা বেশ সচেতন। সাগর-মহাসাগরকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আমাদের অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা এসব সাগর-মহাসাগর। সমুদ্রে রয়েছে নানা ধরনের সম্পদ। সমুদ্রসম্পদকে আমাদের রক্ষা করা জরুরি- এ বিষয়টি অতীতে খুব বেশি আলোচিত হয়নি।
১৯৫০ সালের দিকে দেখা যায়, পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভারী বা ধাতব পদার্থের পরিমাণ বাড়ছে। ওই সময় মানুষ তেমন সচেতন ছিল না। শিল্পোন্নত দেশগুলো পরিবেশ দূষণ করেই চলছিল। তখন সমুদ্রকে ব্যবহার করা হতো বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে। সমুদ্রের বেশি ক্ষতি করেছে নৌযান। তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল নিঃসরিত হতো সমুদ্রে। এর বহু উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। ১৯৬৭ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সমুদ্রবিরোধের জেরে মাইলের পর মাইল সমুদ্র দূষিত হয়েছিল অপরিশোধিত তেল উপচে পড়ার কারণে। ১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যের উপকূলে দুই লাখ ২০ হাজার টন তেল উপচে পড়েছিল। এ ছাড়া উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি উপকূলে এক কোটি ঘন টন তেল ফেলা হয়েছিল। এসব কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক প্রাণীর মৃত্যু হয়। বিলুপ্ত হয়ে যায় বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যায়। ব্যবহারের পর এসব প্লাস্টিক ফেলা হয় সমুদ্রে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে সমুদ্রের পানি দূষণ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ডুবন্ত জাল ব্যবহার করে শিকার করা হচ্ছে মৎস্য সম্পদসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী। ফলে গোটা বিশ্বে সমুদ্র, উপকূলবর্তী এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ। এ ক্ষতির জন্য মোটাদাগে দায়ী বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো।
প্রসঙ্গত, ব্লু ইকোনমি ধারণাটি খুব বেশি দিনের নয়। সমুদ্রসম্পদ, সমুদ্রসীমা বা সমুদ্র-সংশ্নিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষেরও পরিচয় অল্প দিনের। জমির মতো করে যে সমুদ্রের সীমানা নির্ধারণ করা যায় বা এ নিয়ে যে বিতর্ক চলতে পারে, তা জনসাধারণের বোধগম্য ছিল না। বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্র জয় করার পরই মূলত এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ ধারণা পায়। আমরা বুঝতে পেরেছি, সমুদ্রসম্পদ রক্ষা করা কতটা জরুরি। এখন সে জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা পানিসম্পদ রক্ষা বিষয়ে অতীতে অনেক কথা বলেছি; বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছি। তবে  বর্তমানে প্রাণিসম্পদ রক্ষার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের বিশাল উপকূল জুড়ে রয়েছে বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ। সেই সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে দেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়ে যাবে। সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার প্রতিশ্রুতি রয়েছে আমাদের ব-দ্বীপ পরিকল্পনায়। এখন সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দরকার। আমাদের বিশাল জলরাশি ও সম্পদকে বাস্তু ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সমুদ্রকে কোনোভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। এটা যেমন দেশীয় সমুদ্র সীমানার মধ্যে হবে, তেমনি সমুদ্রসম্পদের ক্ষতিসাধন রোধে বিশ্বে আমাদের উচ্চকণ্ঠ থাকবে।
আমরা দেখি, জাতিসংঘের গ্রিন ইকোনমি প্রতিবেদনে সমুদ্রের করুণ পরিণতি ফুটে উঠেছে। এ জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়। আমরা জানি, শিল্পায়নের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সমুদ্রসম্পদ কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে। একই কারণে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এতে সমুদ্র ও উপকূল এলাকার প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রাণী ও জীবকুলের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি গোটা জীববৈচিত্র্যই সংকটে পড়ছে। মনে রাখা দরকার, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে আমাদের স্বার্থেই। নিজেদের খাদ্য চাহিদা মেটাতে কোনোভাবেই জীববৈচিত্র্যের খাদ্যচক্র নষ্ট করা যাবে না।
সমুদ্রসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তাও যে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব- এর প্রমাণ আমরা ইতোমধ্যে হাতেকলমে পেয়েছি। কভিডের সময় পরিবেশদূষণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল প্রকৃতির ওপর। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্তপ্রায় কিছু প্রাণী বিশেষত সামুদ্রিক প্রাণীর বিপুল বিচরণ আমরা দেখেছি। আমরা সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রেখে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারি।
আমি মনে করি, সমুদ্রসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে সামুদ্রিক এলাকাকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশের বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ চুক্তির মধ্যেও জলসম্পদের কথা বলা হয়েছে।
আমাদের বিশাল সমুদ্র এলাকা ও বিপুল সম্পদকে সুনীল অর্থনীতির ভিত্তিতে ব্যবহার করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারি। এ জন্য খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের উপকূল, সুন্দরবন এবং পানি ব্যবস্থাপনা গড়তে হবে ব্লু ইকোনমির ভিত্তিতে। কারণ এগুলোর একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখা এবং সমুদ্রসম্পদ রক্ষার বিষয়ে উপকূলের স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে হবে। সংশ্নিষ্ট প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার যাতে তারা অনেক বেশি জানতে পারেন এবং সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন সমুদ্রসম্পদ রক্ষায়। এবারের আন্তর্জাতিক সমুদ্র দিবসে এটাই হোক অঙ্গীকার।
পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন