রোববার মাত্র ৪৪ মিলিমিটারের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা হাঁটু ও কোমরপানিতে তলিয়ে যাওয়ার যে চিত্র সোমবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, তা নতুন নয়। বস্তুত গত এক দশকের বেশি সময় ধরেই নয়নাভিরাম এই নগরীকে আমরা মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতে এভাবে 'পানির নিচে' তলিয়ে যেতে দেখছি। দিন দিন পরিস্থিতি কতটা নাজুক আকার ধারণ করছে, সোমবার সমকালের প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত আলোকচিত্রেই তা স্পষ্ট। ফলে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও বিস্মিত হই না। কিন্তু মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদনে নতুন যে তথ্য মিলছে, তাতে দেখা যাচ্ছে- চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত কয়েক বছরে কমবেশি ১১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। কিন্তু এর সুফল মিলছে না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্পে মূল কাজ ছিল গত বছর জুনের মধ্যে নগরীর খালগুলো খনন ও দখল উচ্ছেদ করা। কিন্তু সেই কাজ এখনও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

স্বীকার করতে হবে, এর অন্যতম প্রধান কারণ খাল দখলদারদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়নের সময়ই বাস্তবায়নের এসব চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করা উচিত ছিল না? আমরা গভীর হতাশার সঙ্গে দেখছি, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে চট্টগ্রাম সিটি কপোরেশন আরেক কাঠি সরেস। সেই ২০১৪ সালে নতুন একটি খাল খননের প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। গত কয়েক বছরে দুই দফা সময় ও কয়েক গুণ ব্যয় বাড়লেও কাজই এখনও শুরু করতে পারেনি। কমবেশি একই পরিস্থিতি জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি নিস্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাম্পহাউস নির্মাণ প্রকল্পের। এবারের জলাবদ্ধতার 'প্রতিক্রিয়া'য় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র অবশ্য আরেকটি নতুন কথা বলেছেন। তার মতে- নগরীর বিভিন্ন খালের মুখে 'প্রকল্পের প্রয়োজনে' বাঁধ দেওয়াতেই এমন পরিস্থিতি। আমাদের প্রশ্ন, প্রকল্প সংশ্নিষ্টরা কি জানতেন না বর্ষাকাল আসছে? যদি এতটুক দূরদর্শিতা না থাকে, তাহলে এসব প্রকল্প নগরীর কতটা উপকারে আসবে, সেই সন্দেহ অমূলক হতে পারে না। আর মেয়রেরই বা 'ঠেকে শিখতে' হচ্ছে। বর্ষায় নগরীর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে- দেশের অন্যতম প্রধান একটি নগরীর প্রথম নাগরিকের তা বিবেচনায় থাকবে না?

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের 'জলাবদ্ধতা নিরসন' প্রকল্পের পরিচালকও অবশ্য সমকালের কাছে দেওয়া বক্তব্যে মেয়রের পর্যবেক্ষণ কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন। চট্টগ্রাম ডুবে যাওয়ার পর তিনি 'কুইক রেসপন্স টিম' নামানোর কথা বলছেন। এটা স্পষ্ট যে, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক সংস্থার ততধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন চললেও সমন্বয়ের অভাব প্রকট। ফলে এ প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে যে, নগরবাসী যদি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তিই না পায়, বিপুল অর্থ ব্যয় করে এসব প্রকল্পের অর্থ কী? এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা অনেকবার লিখেছি- নিসর্গের কোলে গড়ে ওঠা দেশের গুরুত্বপূর্ণ নগরীটির এই পরিণতি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা জানি, পাহাড় কিংবা নদী সংলগ্ন নগরের সুবিধা হচ্ছে, সেখানে বৃষ্টির পানি আটকে থাকে না। প্রাকৃতিক ঢাল ও স্রোতস্বিনীই পানি নিস্কাশনে সহায়তা করে থাকে। চট্টগ্রামে প্রকৃতির এই দুই আশীর্বাদের পাশাপাশি সাগরও উদার বুক পেতে রয়েছে।

তারপরও প্রতি বর্ষায় সবুজ নগরীটির জীবনযাত্রা ঘোলা জলে ধূসর হয়ে উঠবে কেন? এর কারণ হিসেবে কর্ণফুলী নদী এবং নগরের অভ্যন্তরীণ খালগুলো ভরাট হওয়ার যে কথা বলা হয়, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। খোলা চোখেই ধরা পড়ে। মূল বিষয় হচ্ছে, এই সমস্যা সমাধানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কী করছেন? সেক্ষেত্রে আমরা মহাকাব্যিক ব্যর্থতাই দেখতে পাচ্ছি। আমরা মনে করি, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন তো হতেই হবে; একই সঙ্গে নগরীতে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বিসবুজীকরণ ও নিম্নাঞ্চল ভরাট বন্ধ করতেই হবে। কারণ এর ফলে একদিকে বৃষ্টির পানির প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নালা, খাল ও নদী ভরাট করছে। রোগের কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল ওষুধপত্র দিলে তো চলবে না!

মন্তব্য করুন