বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বার্ষিক আড়াই হাজার থেকে চার হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিপাত হয়। এই বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলীতে পতিত হয়। চট্টগ্রাম পূর্বে সমুদ্র, পূর্ব-দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে কর্ণফুলী নদী, উত্তর-পূর্ব দিকে হালদা নদীবেষ্টিত। উচ্চ জোয়ার ও বৃষ্টিপাতের কারণে খালগুলোতে অত্যধিক পানিপ্রবাহে প্রাকৃতিক নিস্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিস্কাশন ব্যবস্থাপনার অভাবে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবন-জীবিকায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ২২টিতে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে কমবেশি জলাবদ্ধতা হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় চান্দগাঁও, পূর্ব ষোলশহর, শুলকবহর, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, পূর্ব বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, উত্তর আগ্রাবাদ, দক্ষিণ আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, বকসিরহাট, গোসাইলডাঙ্গা, উত্তর মধ্যম হালিশহর এলাকার মানুষদের।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে চাক্তাই খাল খননসহ বেশকিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ওই সব প্রকল্পের সুফল পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৭ সালে গ্রহণ করা হয় তিন বছর মেয়াদি একটি মেগা প্রকল্প। যার বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ওই বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাসময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় সম্প্রতি প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। আর সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জন্য ১৯৬৯ সালে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে আমেরিকান জন আর স্নেলের কোম্পানি। তারা চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে ৭০টি খালের জরিপ করেছিল। এর মধ্যে তারা চাক্তাই খালের দৈর্ঘ্য ৩৪ হাজার ৫০ ফুট পেয়েছিল। কিন্তু এই খাল সংরক্ষণ না করায় চরমভাবে নগরবাসীকে মূল্য দিতে হচ্ছে। তেমনি মির্জার খালসহ আরও বেশকিছু খাল হাওয়া হয়ে গেছে। স্নেল কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে ৩৪টি খালের সংযোগ দেখেছিলেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, খাল রয়েছে মাত্র ২২টি। সরকারের সেবাদানকারী সংস্থাগুলো পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণে বছরের পর বছর নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে শাখা-প্রশাখা মিলিয়ে ১১৮টি খালের মোট দৈর্ঘ্য ১৮২ দশমিক ২৫ কিলোমিটার। বর্তমানে পাকা ও কাঁচা নালা-নর্দমা আছে যথাক্রমে ৭১০ কিলোমিটার ও ৫৫ কিলোমিটার। খাল ও নালা-নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলন করে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি সব সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করার বিকল্প নেই। কেবল জোড়াতালির কাজ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বৃষ্টি ও জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতা কিংবা বন্যা- এসব দুর্ভোগ থেকে চট্টগ্রাম নগরবাসীকে মুক্তি দিতে ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ 'চিটাগাং স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টারপ্ল্যান' তৈরি করেছিল। এটি 'ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা' নামে পরিচিত। নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে কী করণীয়, এই মহাপরিকল্পনায় এর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি ওই মহাপরিকল্পনায় খালগুলো উদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছিল। এরই সঙ্গে সঙ্গে জলাধার সংরক্ষণের ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে যা জলাবদ্ধতা দূরীকরণে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু গত দুই দশকেও এর সুপারিশগুলো কার্যকর হয়নি।
মোদ্দাকথা হলো, বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যত মেগা প্রকল্পই হাতে নেওয়া হোক না কেন, ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রণয়নের পর অনেক সময় চলে গেছে। তাই এই মহাপরিকল্পনাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংশোধন ও পরিমার্জন করে আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি নগরীর সব সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর বিশেষ করে বিআইপি, আইইবি, আইএবি ইত্যাদির সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। একটি বাসযোগ্য নগরীর অন্যতম কারিগর নগর পরিকল্পনাবিদগণ। তাদের সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ দিয়ে পরিকল্পিত ও টেকসই নগরী গড়ে তোলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব।
সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)
shahjalalmisuk@gmail.com

মন্তব্য করুন