এক গভীর, সুপ্ত মনোবাসনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল উত্তরবঙ্গ জাদুঘর। সেই অস্পষ্ট ছাইচাপা আগুন থেকে সৃজন হলো যার- তার বাস্তব অবয়ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শুভবারতা নিয়ে।
উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা আব্রাহাম লিংকন। রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, লেখক ও কবি। নেপথ্যে নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে চলেছেন জীবনসঙ্গিনী সহকারী অধ্যাপক নাজমুন নাহার সুইটি। আব্রাহাম লিংকন প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির একজন সফল সংগঠক হিসেবে সেই সময়েই অনুভব করেছিলেন এদেশে ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের আগ্রহ ও প্রতিষ্ঠানের অভাব। সেই অভাব মোচনের তাগিদ থেকেই একটু একটু করে দৃশ্যমান হচ্ছে প্রান্তিক জেলা কুড়িগ্রামে এই উত্তরবঙ্গ জাদুঘর- দেশ ও কালের মহত্তর সাক্ষী হয়ে।
২০১২ সালে তিনি, তার স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র শাশ্বত গৌরব সিদ্ধার্থের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করলেন আপাতত নিজের বাড়িতেই হবে সেই স্বপ্নের জাদুঘর। রাতে বাসভবন আর দিনে জাদুঘর। যা ছিল একেবারেই অভিনব- সামনে এ ধরনের তেমন উদাহরণ ছিল না। নাজিরা, নতুন শহর, কুড়িগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হলো উত্তরবঙ্গ জাদুঘর। প্রথম দিকে ড্রইংরুমটি নিয়ে কাজ শুরু হলো, আগে থেকে সংগৃহীত স্মারকগুলো সাজিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। তারপর ধীরে ধীরে শুরু মূল অভিযান। স্মারকদাতা পাওয়াই যাচ্ছিল না প্রথমে। হতোদ্যম হননি লিংকন- একসময় সবার মনের অবিশ্বাসের অর্গলটা ভেঙে গেল। এখন সবার সহযোগিতায় উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের অস্থায়ী ভবনে মূল্যবান স্মারক উপচে পড়ছে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্মারক প্রদর্শন করা যাচ্ছে না শুধু জায়গার অভাবে। বলা যায়, এক সমৃদ্ধ অনন্য প্রতিষ্ঠানে বাস্তবিক রূপ নিয়েছে স্বপ্নের জাদুঘরটি।
বিদগ্ধজন জানেন, সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান করা আর একটা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজ অনেক বেশি ভিন্ন ও চ্যালেঞ্জের। আব্রাহাম লিংকন দমার পাত্র নন! একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। একটি ট্রাস্ট গঠন করে উত্তববঙ্গ জাদুঘরকে সেই ট্রাস্টের হাতে তুলে দিলেন। শুধু তাই নয়, বর্তমান অস্থায়ী জাদুঘর অর্থাৎ তার বাসভবনের লাগোয়া দুর্মূল্য ২০ শতাংশ জমি তিনি এবং তার স্ত্রী মিলে দান করে দিলেন উত্তরবঙ্গ জাদুঘরকে। সেইসঙ্গে চমৎকার, দৃষ্টিনন্দন, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি ডিজাইন ও পল্গ্যান তৈরি হয়ে গেল, আর সেটা খুশিমনে তৈরি করে দিলেন দেশের তরুণ স্থপতিরা। উত্তরবঙ্গ জাদুঘর এখন শুধু কোনো এক ভোরের সুখস্বপ্ন নয়, বরং মাটির ওপরে দাঁড়ানো নিরেট সত্য; যা গড়ে উঠছে কুড়িগ্রাম জেলার উল্লেখযোগ্য বরেণ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সবার স্বতঃস্ম্ফূর্ত সহযোগিতায় বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ও বিশ্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যের মহামূল্য স্মারকে দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে উত্তরবঙ্গ জাদুঘর।
উত্তরবঙ্গ জাদুঘর যে ধীরে ধীরে একটা মূল্য তৈরি করতে পেরেছে- দেশের অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠছে, সেটি দেশ-বিদেশের ব্যক্তিবর্গের এই জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়। মন্তব্য বইয়ের মন্তব্যগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে জাদুঘর পরিদর্শনে আসা ব্যক্তিদের চেতনা ও আবেগকে যে কতটা স্পর্শ করেছে প্রতিষ্ঠানটি- সেটি অনুধাবন করা যায়। এখানে যেমন রাজাকারের তালিকা প্রদর্শিত হছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বহু দুষ্প্রাপ্য স্মারকসহ শতাব্দীপ্রাচীন অনেক জিনিস প্রদর্শিত হচ্ছে।
সমস্যা ছিল অন্যখানে, উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের নতুন ভবনের জন্য অর্থ সংগ্রহ নিয়ে। সেটিরও খানিকটা সমাধান হয়ে গেল। সরকার আব্রাহাম লিংকনের মহৎ উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দুই কোটি টাকা বরাদ্দও করল। আজ বুধবার এই জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বেজমেন্টে থাকবে লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, অফিস ও সেমিনার হল। গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকবে থিয়েটার হল। জাদুঘরের মূল বিষয় প্রদর্শনী কক্ষ থাকবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়। সেই অংশ নির্মাণের বরাদ্দও দ্রুততম সময়ে দেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা। সরকারের এই সদিচ্ছা আসলে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতিবাচক মনোভাবই প্রকাশ করে। উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে সরকারি এই অনুদান মুক্তচিন্তার অনেক জানালা খুলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বহুকাল ধরে তার আলো ছড়াতে থাকবে মহাপৃথিবীতে।
আগেই বলেছি জাদুঘর কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়- প্রতিদিনই তাকে নিত্যনতুনে সমৃদ্ধ করতে হয়। আর তার জন্য দরকার হয় সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, আবার তাৎক্ষণিক অনেক সিদ্ধান্ত। দুই কোটি টাকার কথা শুনলে হয়তো চট করে মনে হতে পারে- এ তো অনেক! আসলে কি তাই? না এটা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় হলেও সামনের দিকে তাকালে আসলে আরও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। শুধু স্থাপনার কিছুটা হয়তো এ দিয়ে মেটানো গেলেও সবটা নয়। অনেকে জানেন স্মারক সংগ্রহ, সংরক্ষণ এক বিশাল যজ্ঞ- বিশেষত বহু শতাব্দী ধরে যাতে স্মারকগুলো টিকে থাকে তার ব্যবস্থাপনাতেই প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। তাই অর্থ সংকটে যাতে না পড়তে হয়- তার জন্য উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে সরকারি- বেসরকারি, ব্যক্তিগত নানাভাবেই নিয়মিত অনুদান প্রয়োজন হবে। তবে আশা করা যায়, এ ব্যাপারে সরকারি ও ব্যক্তিগত উদার বিবেচনা অব্যাহত থাকবে। আমরাও আহ্বান জানাব তেমনটিই যেন হয়।
উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের এই ঐতিহাসিক সুবর্ণমণ্ডিত দিনটিতে অনিঃশেষ শুভকামনা। আমাদের সংস্কৃতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হয়ে এগিয়ে ক্রমে সমৃদ্ধ হবে এই প্রতিষ্ঠান, সেই প্রত্যাশা প্রাণভরে।
লেখক, সংস্কৃতিকর্মী

মন্তব্য করুন