দীর্ঘ ১৫ মাস বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সরকারের সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী এইচএসসি, এসএসসি ও পঞ্চম শ্রেণিতে শিক্ষা কার্যক্রম হবে সপ্তাহে ছয় দিন। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে নবম এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস হবে সপ্তাহে এক দিন। এতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকবে সীমিত। তথাপি অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন থাকছে, শ্রেণিকক্ষের ভেতর শিক্ষার্থীদের আসন ব্যবস্থা কেমন হবে? শ্রেণিকক্ষে কি তাদের মাস্ক পরে থাকতে হবে? শিক্ষক কি মাস্ক পরে ক্লাস পরিচালনা করবেন?
করোনাকালীন শিখন কার্যক্রমে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। কারণ ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে টিভি এবং পরবর্তী সময়ে রেডিওর মাধ্যমে পরিচালিত দূরশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে এবং তাও সমানভাবে নয়। শিখনের তফাত রয়েছে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে। এ ছাড়া শুরুতে শিশুদের মধ্যে যে আগ্রহ ছিল তাও সময়ের ব্যবধানে কমে আসে। অন্য আরও একাধিক গবেষণায় ইঙ্গিত করা হয়, করোনাকালীন শিক্ষার ওপর যে প্রভাব পড়েছে সেটি শুধু এ সময়ের ব্যাপার নয়, বরং এটি শিক্ষার ক্ষেত্রে পুঞ্জীভূত ঘাটতির সমস্যা।
এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়গুলো যখন খুলবে, তখন শিক্ষকরা কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন? ধরা যাক, ২০১৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল একটি শিশু। সে এক বছর শিক্ষা কার্যক্রম শেষে ২০২০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। ২০২০ সালে ওই শিশুটি দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে সামান্যই অংশগ্রহণ করেছে। ২০২১ সালে সে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ইতোমধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রমেরও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেল। ফলে অনেকেই সন্দিহান, এই শিশুটি ২০১৯ সালের যে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করেছিল তার কিয়দংশ সে হয়তো ইতোমধ্যে ভুলে যেতে পারে। বিআইজিডি ও পিপিআরসির যৌথ গবেষণা থেকে আমরা জেনেছি, অনেক শিশু করোনাকালে প্রাইভেট শিক্ষকের সহযোগিতা নিয়েছে। তাই তাদের ক্ষেত্রে অবস্থা হবে খানিকটা ভিন্ন, আর এখানেই আসছে বৈষম্যের অন্য একটি দিক। একজন শিক্ষককে তাই এরকম একটি বৈচিত্র্যময় শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করতে হবে।
আমি মনে করি, এ জন্য দুই থেকে তিন বছর মেয়াদি একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ। প্রথমত, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতসহ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করার ফলে শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যে জড়তা তৈরি হয়েছে। তারা কিছু বিষয় ভুলেও গেছে। তাই নতুন করে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য একটা আনন্দঘন শিখন-পরিবেশ তৈরি করতে হবে। স্কুল খোলার শুরুতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা কোন পর্যায়ে আছে, সেটি মূল্যায়ন করতে হবে। এতে শিক্ষক বুঝতে পারবেন শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অবস্থা কী এবং পাঠ পরিকল্পনা কেমন হবে? শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং ওরিয়েন্টেশনের প্রয়োজন কেমন হবে? এই বিষয়গুলো বিবেচনা করার প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, আমরা করোনা-পূর্ব সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী একইভাবে উপকৃত হয় না। এ অবস্থার টেকসই পরিবর্তন জরুরি। অল্পসংখ্যক হলেও বাংলাদেশে এমন কিছু বিদ্যালয় আছে যেখানে শুধু মুখস্থ করার পরিবর্তে শিশুদের উৎসাহিত করা হয় পর্যবেক্ষণ, বিশ্নেষণ এবং হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে শিখন-কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার জন্য। এই শিখন-কার্যক্রম সংঘটিত হতে পারে এককভাবে, জুটিতে অথবা ছোট দলে।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিপূরক শিখন-কার্যক্রম হতে পারে নানাভাবে- টিভি, ইন্টারনেট, বেতার অথবা কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন নির্ধারিত সময়ে, বিশেষ করে সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনগুলোতে এটি প্রচার করা যেতে পারে। কোনো কারণে কোনো শিক্ষার্থী যদি স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে এই পরিপূরক ক্লাস থেকে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। এটি স্বল্পমেয়াদে যেমন শিক্ষার্থীদের উপকৃত করবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করবে।
চতুর্থত, করোনা-পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার হবে যে শিশুরা কতটুকু শিখছে, কোথায় ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতি মন্থর? নির্ধারিত সময়ের পর এটি মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি হবে চলমান মূল্যায়নের অংশ। শিক্ষক নিজে যেন এই চলমান মূল্যায়ন সংগঠিত করতে পারেন এবং মূল্যায়নের ফল বিশ্নেষণ করে শিখন-কার্যক্রম সুসংগঠিত করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; এ লক্ষ্যে শিক্ষকদের তৈরি করতে হবে। চলমান মূল্যায়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্য যথাযথ সংরক্ষণ করলে পরবর্তী সময়ে এগুলো শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে নানাভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
পঞ্চমত, প্রস্তাবিত শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে শিক্ষক এবং স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষাসংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করার প্রয়োজন হবে। প্রশিক্ষণ হতে হবে প্রশিক্ষণার্থীর উপযোগী। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং শিখন-কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণার ভিন্নতা রয়েছে। তাই এ প্রশিক্ষণটি এমনভাবে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে যেন প্রস্তাবিত মূল বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রশিক্ষণকালীন শিক্ষকদের এ বিষয়গুলোর ওপর যৌক্তিকতা, দক্ষতা এবং মানসিক পরিবর্তনসহ বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ-উত্তর সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা জরুরি হবে।
এ রকম প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আছে। কিন্তু কিন্ডারগার্টেন বা ছোট ছোট এনজিও দ্বারা পরিচালিত উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং বড় বড় এনজিও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন হবে বাড়তি বিনিয়োগের। বিনিয়োগ থেকে যে প্রাপ্তি আসবে তা অনেক বেশি। শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য দরকার সাহসী এবং ভবিষ্যৎমুখী প্রতিকারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা। এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হবে অবলোকন করা এবং অবলোকন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। করোনা-উত্তর বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আমার প্রস্তাবের লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়নের অভিযাত্রাকে সুদূরপ্রসারী করা, যেন বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যাত্রা সুসংহত করতে পারে।
সাবেক পরিচালক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি

মন্তব্য করুন