বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থিক অব্যবস্থাপনার বিষয়টি যেমন স্পষ্ট, তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট আমাদের দুর্নীতি। মাঝে মাঝে বিষয়টি আলোচনায় এলেও সমাধান হচ্ছে না কিংবা তেমন পদক্ষেপ আমরা দেখছি না। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থ পাচারের বিষয়টি আলোচনা হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে তা প্রচার হয়। বাজেট পাসের পর চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাসের আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় সংগতই অর্থ পাচার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাচার ঠেকাতে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে কয়েকজন সংসদ যে অভিযোগ করেছেন, তার সত্যতা অস্বীকারের উপায় রয়েছে সামান্যই।
কেবল অর্থ পাচার নয়, এর সঙ্গে শেয়ারবাজারসহ আর্থিক খাতের নানা অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এসব কিছুর মূলে রয়েছে দুর্নীতি। এটা সাধারণ কোনো দুর্নীতি নয়, বরং দেশে দুর্নীতি যে ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে তারই প্রমাণ। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে অসাধুরা বেপরোয়া হয়ে লুটপাট করে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করে। কানাডা, মালয়েশিয়াসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই টাকা পাচার হচ্ছে। এমনকি অনেকে সুইস ব্যাংকে পাচারকৃত অর্থ জমা রাখেন।
আমরা বিস্মিত, সোমবার জাতীয় সংসদের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কারা টাকা পাচার করছে, সে তালিকা নাকি তার কাছে নেই। তিনি অর্থ পাচারকারীদের নাম দিতে বলেছেন। এ কেমন কথা! একজন দায়িত্বশীল কীভাবে বলতে পারেন, তার কাছে তালিকা নেই। এর আগেও দেখেছি, আমরা যখন বললাম নতুন দরিদ্রদের জন্য পদক্ষেপ নিতে, তিনি বলেছেন তালিকা নেই। তার কাছে যদি তালিকা না থাকে, তবে কার কাছে থাকবে? আমরা জানি, অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ আছে। আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরও। এসব প্রতিষ্ঠান তাহলে কী করছে?
আমাদের মনে আছে, গত নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের যে গুঞ্জন আছে, তার কিছুটা সত্যতা রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া ২৮টি ঘটনার মধ্যে সরকারি কর্মচারীই বেশি। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর হাইকোর্ট বিষয়টি নজরে এনে তথ্য চাইলে- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১৭ ডিসেম্বর আদালতে অর্থ পাচারের অপরাধে ২০১৬ থেকে তখন পর্যন্ত কতগুলো মামলা করেছে, কতগুলো অভিযোগ তদন্ত করেছে, কত টাকা বিদেশ থেকে ফেরত এনেছে সেসব তুলে ধরে। সেখান থেকেও তো অর্থমন্ত্রী তথ্য নিতে পারেন।
বলাবাহুল্য সংবাদমাধ্যমে অর্থ পাচারের সিরিজ প্রতিবেদন আমরা দেখেছি। বিশেষ করে দেশের কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পাচারের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। আলোচিত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলকে সাংসদ থাকা অবস্থায় মানব পাচার, ভিসা জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে কুয়েত থেকে গ্রেপ্তার করে সেখানকার পুলিশ। যদিও পরে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। বহুল আলোচিত পি কে হালদার আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলের পর সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কীভাবে কানাডায় বহাল তবিয়তে আছেন, সে খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে গুরুত্বের সঙ্গে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময়ও সংবাদমাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের সংবাদ প্রকাশ হয়।
বিভিন্ন দেশের অর্থ পাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেন বিষয়ক ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআইর তথ্য অনুযায়ী পণ্যের প্রকৃত মূল্য না দেখিয়ে বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে বছরে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। কর ফাঁকি, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ গোপন করা, কোম্পানির মুনাফা লুকানো, পরিবারের সদস্যদের উন্নত জীবনযাপন ও আবাসনের ব্যবস্থা করা এবং দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি না থাকা ইত্যাদি নানা কারণে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। আমরা দেখছি ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হতে শুরু করে সম্পদশালী অনেকেই বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অর্থ পাচার রোধ করতে হলে পাচারের পথ বন্ধ করতে হবে আগে। পাচার হয়ে গেলে টাকা উদ্ধারে চিঠি চালাচালি করার আমলাতান্ত্রিক চর্চার কোনো কার্যকর ফল আসে না। প্রথমেই অর্থ পাচার বন্ধে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দুর্নীতির সব পথ বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচার বন্ধে সরকার যদি সত্যিই আন্তরিক হয়ে থাকে, সরকারের উচিত হবে- পাচারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া। বড় বড় অপরাধীর শাস্তি হলে ছোট অপরাধী, বিশেষ করে যারা ভবিষ্যতে অর্থ পাচারের চিন্তা করছে তারাও ভয় পাবে।
অর্থ পাচার বন্ধে কিছু সংস্কার সাধন করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কেউ ক্ষমতা বা অর্থের বিনিময়ে ঋণ নেওয়া বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা যাতে ভোগ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া চাই।
সর্বোপরি, দুর্নীতির মূলোৎপাটন করাতে না পারলে সুশাসন যেমন নিশ্চিত করা যাবে না, তেমনি বিদেশে অর্থ পাচারও বন্ধ হবে না। এটা সর্বজনবিদিত যে, সরকারি খাতে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয় তাতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকে। এ ছাড়া নানা ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগের কথা বলাই বাহুল্য। দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা যদি অর্থ পাচারের কথা স্বীকার না করেন, যদি তালিকা নেই বলে এড়াতে চান- সেটি দুঃখজনক। সদিচ্ছা থাকলে বাস্তবতা স্বীকার করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না।
অর্থনীতিবিদ

মন্তব্য করুন