ইসলাম এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। মানব জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান রয়েছে এতে। অন্যান্য বিষয়ের মতো উপার্জনের ব্যাপারেও নির্দেশনা রয়েছে ইসলাম ধর্মে। ইসলামী শরিয়ত নির্দেশিত মূলনীতির আলোকে যে উপার্জন করা হবে তা হালাল বলে গণ্য হবে। ইসলাম হালাল রিজিক উপার্জন করতে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সুরা বাকারার ১৬৮ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- 'হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তোমরা তা আহার কর এবং কোনোক্রমেই শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'
সুরা বাকারার ১৭২ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরও এরশাদ করেন- আমি যে রিজিক তোমাদের দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো। অন্যত্র সুরা জুম'আর ১০ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরও এরশাদ করেন-
অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ রিজিক তালাশ করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। সুরা আল-মু'মিনুনের ৫১ আয়াতে এরশাদ হয়েছে- তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎ কর্মশীল হও। তোমরা যা করছো আমি তা জানি। মহান আল্লাহ সুরা আনকাবুতে আরও এরশাদ করেন- তোমরা আল্লাহর কাছে রিজিক তালাশ করো, তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।
হালাল উপায়ে রিজিক উপার্জন করার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলে পাক (সা.) এর অসংখ্য হাদিস রয়েছে। এ বিষয়ে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন- 'ফরজ ইবাদতসমূহের পরে হালাল উপার্জন করাও একটি ফরজ।'
অন্য আরেক হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন- 'ওই গোশত দেহ জান্নাতে যাবে না, যা হারাম খাবার থেকে উৎপন্ন। জাহান্নামই এর উপযোগী। (তিরমিজি)।
হালাল উপার্জন ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। মানবজীবনে বৈধ উপায়ে জীবিকা উপার্জন করা অপরিহার্য সওয়াবের কাজ।
হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন- রাসুলে পাক (সা.) বলেন, হে লোকেরা তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং বৈধ উপায়ে জীবিকা উপার্জন করো। কেননা, কোনো প্রাণীই তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না, যদিও কিছু বিলম্ব ঘটে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং সৎভাবে জীবিকা অর্জন করো। যা হালাল তাই গ্রহণ করো। এবং যা হারাম তা বর্জন করো।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ নবী ও রাসুলরা। তারাও কোনো না কোনো পেশা অবলম্বন করেছেন, শ্রম দিয়েছেন। আদি পিতা হজরত আদম (আ.) কৃষক ছিলেন। হজরত নূহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) দর্জি ছিলেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) রাজমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত ইসমাঈল (আ.) রাজমিস্ত্রির জোগালি ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ছাগল চরিয়েছেন।
সাহাবায়ে কেরামও নবীজি (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। হজরত আবু বকর (রা.) ব্যবসা করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র-সংক্রান্ত কাজের জন্য বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়েছেন। হজরত ওমর (রা.)ও ব্যবসা করেছেন। তিনি মুসলমানদের হালাল রিজিক অনুসন্ধানের জন্য কাজ করতে খুব উৎসাহ দিতেন।
হজরত ওসমান (রা.) জাহেলিয়াত ও ইসলাম উভয় সময়কালে কাপড়ের ব্যবসা করেছেন। আলী (রা.) তো বিনিময় হিসেবে কিছু খেজুর পাওয়ার জন্য কূপ থেকে পানি ওঠানোর কাজ করতেন। খাব্বাব (রা.) কর্মকার ছিলেন; এটা অনেকেই জানেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মেষ-বকরি চরাতেন। সাহাবায়ে কেরাম মূলত বিভিন্ন পেশার ছিলেন। আনসাররা সাধারণত কৃষিকাজ করতেন। আর মুহাজিররা সাধারণত ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। পক্ষান্তরে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত সম্পদ পুরাই ধ্বংস। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, 'যে বান্দা হারাম সম্পদ অর্জন করে, যদি তা সদকা করে দেয় তবে তাও কবুল হবে না। আর যদি খরচ করে তাহলে তাতে বরকত নেই। মৃত্যুর পর রেখে গেলে তবে জাহান্নামে যাওয়ার উপকরণ।' (মুসনাদে আহমদ)
হারাম সম্পদ কম আর বেশি নয়, এর থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা একমাত্র হালাল খাবার দ্বারাই সমাজজীবন ঠিক থাকে। নিজের হাতে আয়-উপার্জন করা সর্বোত্তম কাজ। নবী-রাসুলরা নিজ হাতে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করতেন। সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত বৈধ পন্থায় জীবিকা ও সম্পদ উপার্জন করা।
বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বিষয় : হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

মন্তব্য করুন