অসংখ্য উচ্চফলনশীল ফল ও ফসলের জাত উন্নয়নের কারিগর কৃষিবিজ্ঞানীর নাম এম এ খালেক মিয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরকৃবি) প্লান্ট ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিথযশা এই শিক্ষক ও গবেষক সম্পর্কে আগেই জেনেছিলাম তার সহকর্মীদের থেকে। ২০১২ সালের অক্টোবরে গবেষণায় উদ্ভাবিত একটি নতুন জাতের ফসলের সাফল্য সরেজমিন দেখতে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সামনাসামনি দেখা এবং কথা বলার সময় শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে মাথা নুইয়ে এলো। এমন অসাধারণ যার গবেষণা সাফল্য, ঈর্ষণীয় একাডেমিক ক্যারিয়ার যার ব্যক্তিজীবনে, তিনি ততটাই আড়ম্বরহীন, স্বল্পবাক!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগে তিনি কর্মরত ছিলেন ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। অবাক করার বিষয় হলো, উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. এম এ খালেক মিয়া উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো একাডেমিক পদ অলঙ্কৃত করতে পারেননি। তিনি আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। কিন্তু এই উপলব্ধি আজ তাড়িত করছে যে, একজন খালেক মিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত হতে না পারার পেছনে তার কোনো অযোগ্যতা ছিল না। ছিল আমাদের সামগ্রিক সিস্টেমের অযোগ্যতা-অদূরদর্শিতা।
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পার করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। পেশাগত কারণে বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরিবর্তিত জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ক্রমাগত যে বিবর্তন ঘটেছে তার কিঞ্চিৎ ধারণা লাভের সুযোগ হয়েছে সেখানে আসা-যাওয়ায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, অপেক্ষাকৃত ছোট একটি ভূখণ্ডে বিপুল জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিবিজ্ঞানীদের বিরাট অবদান। বাংলাদেশে কৃষিতে উচ্চশিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণার সূতিকাগার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেধাবী গ্র্যাজুয়েটরাই দুই দশক আগে ভিত রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের। শুরুতে এটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা) হিসেবে যাত্রা করলেও পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হয়। এরপর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরা কৃষিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বহু বৈচিত্র্য আনয়নে নিমগ্ন হন। দীর্ঘ পরিসংখ্যান তুলে না ধরেও দ্ব্যর্থহীনভাবে এটি দাবি করা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পেরেছে গত দুই দশকে।
দুর্বৃত্তায়িত সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার প্রভাবে আড়ষ্ট দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে আশার প্রদীপ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান কৃষিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিপুল সম্ভাবনাকে জিইয়ে রেখেছিল; কিন্তু আমাদের আশার প্রদীপগুলোতেও ঘুণে ধরতে বাকি নেই। আশাবাদী মানুষ হয়েও এই হতাশার কথা ব্যক্ত করতে হচ্ছে এই জন্য যে, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যদি তার পরম্পরাকে এগিয়ে নিতে না পারে তবে প্রলয় ঘটতে বাকি নেই। 'নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পায় না'- ইতিহাসের চিরন্তন সেই বাণী আজ বাস্তব হয়ে উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালগুলোর উপাচার্যদের নিয়ে প্রকাশিত অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার সঙ্গে এই উদ্বেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেল- গবেষণার জন্য বিশেষায়িত বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকুচিত খোদ প্রতিষ্ঠানটির গ্র্যাজুয়েটদের পিএইচডি করার সুযোগ। উজ্জ্বল সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তার হারানো গৌরব ফিরে পাক। শিক্ষক নিয়োগ কিংবা গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারিত হোক। বিশাল অট্টালিকা তৈরি করে যদি মুক্ত জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করা না যায় তবে শিক্ষার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত হয়।
নেতাজি সুভাষ বসু গবেষক

বিষয় : উচ্চশিক্ষা আশরাফুল ইসলাম

মন্তব্য করুন