আমাদের প্রিয় নগরী ঢাকা বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে বৈশ্বিক সূচকে প্রায় তলানিতে অবস্থান করছে- মঙ্গলবার প্রকাশিত এই খবর বেদনাদায়ক হলেও বিস্ময়কর কি? বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূচক প্রকাশকারী সংস্থা ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ কোনো শহর বা নগরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণে পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে- স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। এসব বিষয়ে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকার মাত্র সাড়ে ৩৩ নম্বর প্রাপ্তি কোনো বিবেচনাতেই 'অস্বাভাবিক' হতে পারে না। তার মানে, এই পরীক্ষায় ঢাকা 'টেনেটুনে পাস' করেছে মাত্র। স্বীকার করতে হবে যে, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে ঢাকা নগরীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বহুলাংশে বজায় রয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রতিবেশ সুরক্ষা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতিশীল। বিশেষত এই প্রতিবেদন এমন সময় প্রকাশ হয়েছে, যখন ঢাকার খোলা মাঠ ও উদ্যানগুলো নতুন করে হুমকির মুখে। শিক্ষার যে পরিবেশ রয়েছে, তা জনসংখ্যার দিক থেকে যেমন অপ্রতুল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসম্মত নয়। অস্বীকার করা যাবে না যে, গত কয়েক বছরে আমরা নতুন নতুন উড়াল সড়ক দেখেছি, নির্মিত হচ্ছে র‌্যাপিড বাস সার্ভিস ও মেট্রোরেল অবকাঠামো। কিন্তু স্বাভাবিক চলাচলের পরিস্থিতি কী, রাজধানীর বেশিরভাগ ফুটপাত মুখ ব্যাদান করে তার সাক্ষ্য দেয়। খোঁড়াখুঁড়ি-লাঞ্ছিত সড়কগুলোর কথা যত কম বলা যায়, ততই কল্যাণকর।

ঘনবসতির এই নগরীতে কতটা ভবন ইমরাতবিধি মেনে নির্মিত হয়, তা একটি বড় প্রশ্ন। আর স্বাস্থ্যব্যবস্থার কী পরিস্থিতি, করোনাকালে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবনতিশীল পরিস্থিতিতে বসবাসযোগ্য নগরীর সূচকে উন্নতি আমরা প্রত্যাশা করি কীভাবে? বস্তুত ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট পরিচালিত এই জরিপ প্রতিবছরই প্রকাশ হয় এবং 'যথারীতি' ঢাকার অবস্থান থাকে বসবাস অযোগ্য শহরগুলোর সারিতে। এবারও আমরা দেখছি, ঢাকার নিচে রয়েছে মাত্র তিনটি শহর- যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত নাইজেরিয়ার রাজধানী লাগোস এবং এখনও বহুলাংশে আদিম ব্যবস্থাধীন পাপুয়া নিউগিনির রাজধানী মোরেসবি। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির অবস্থানও ঢাকার ওপরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ফ্লাইওভার, নতুন নতুন সড়কপথ, হাতিরঝিলের নয়নাভিরাম পরিবর্তনকে এই সূচক যেন উপহাসই করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার অবস্থান নিয়ে আমরা কি বছর বছর কেবল হাহাকার করে যাব? চারশ বছরের পুরোনো এ শহরের কেন এমন অবস্থান, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অথচ মাত্র দুইশ বছর আগেও, ইংরেজ শাসনামলে, ঢাকা ছিল বিশ্বের দ্বাদশতম সুন্দর নগরী।

নিরাপত্তাহীনতা, যানজট ও অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ সেখান থেকে আমাদের বর্তমান অবস্থানে এনেছে। আমরা মনে করি, জনসংখ্যা এক্ষেত্রে একটি বড় বিষয়। ঢাকায় প্রতিদিনই যেভাবে মানুষ বাড়ছে, তাতে করে নাগরিক সেবার ব্যবস্থাপনা সহজ নয়। একটি নগরীর বসবাসযোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য হচ্ছে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক স্থিতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিনোদন, সেবা ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, এসব ক্ষেত্রে ঢাকার ইতিবাচক অর্জন ক্রমেই কমে আসছে। ষাটের দশকে ঢাকা নগরীকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, দুই দফা সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে তা তলানিতে পৌঁছেছিল বলা যায়। কোনো জনপদের দক্ষিণ দিকে নদী থাকলে নগরবিদরা সেটাকে 'সৌভাগ্যবান নগরী' বলে থাকেন। অথচ ঢাকার চারপাশেই নদী ছিল। কিন্তু আমরা এ সৌভাগ্য পায়ে ঠেলে নদীগুলোকে প্রায় মেরে ফেলেছি। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় সমানসংখ্যক খাল নিয়ে ইতালির ভেনিস বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে; কিন্তু ঢাকায় সেগুলোকে পরিণত করা হয়েছে ভাগাড়ে। বস্তুত, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। আমরা মনে করি, এসব বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কীভাবে ঢাকা আবার তিলোত্তমা হতে পারে, এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা হয়ছে। এখন কাজে নামার সময়।

মন্তব্য করুন