প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে। তবে এই সর্বোচ্চ বরাদ্দকে 'শুভঙ্করের ফাঁকি' বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলেন, শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য খাত যুক্ত করে টাকার অঙ্কে বাড়িয়ে দেখানো হলেও, তা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ নয়। অতীতেও এমনটি করা হয়েছে। এবার করোনাকালে অন্তত শিক্ষা খাত সরকারের বিশেষ মনোযোগ পেতে পারত।
গত ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন। এতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্নেষণে দেখা যায়, টাকার অঙ্কে বাড়লেও মোট বাজেটের অংশ হিসেবে এবার শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতসংশ্নিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে শিক্ষা খাতকে বিবেচনা করা হয়। তবে বিগত বছরের মতো এবারও প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে 'শিক্ষা ও প্রযুক্তি' খাত করা হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে গত বছর বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা; যা সংশোধিত বাজেটে নেমে দাঁড়ায় ৭৮ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২১ হাজার ২০৪ কোটি এবং তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
বিশ্নেষণে দেখা যায়, আইসিটি ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাদ দিলে কেবল শিক্ষা খাতে সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমকালকে বলেন, প্রকৃত অর্থে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ সর্বোচ্চ নয়। এতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। অন্যান্য খাতের বরাদ্দকেও শিক্ষার মধ্যে ঢুকিয়ে একসঙ্গে দেখানো হয়।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বরাদ্দও শিক্ষা খাতের বাজেট হিসেবে দেখানো হয়। এতে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু দেখি না। অতিমারিকালেও শিক্ষা খাতের ক্ষতি পোষানোর কোনো পরিকল্পনা বাজেটে দেখতে পেলাম না।
রাজধানীর ধানমন্ডির কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমতউল্লাহ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের সমস্যা ও সংকটগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সেখানে আলাদা কোনো নজর দেওয়া হয়নি।
এডুকেশন আউট লাউড-এর জাতীয় সমন্বয়ক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কে এম এনামুল হক সমকালকে বলেন, বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের মাত্র ১১.৯২ শতাংশ। জাতীয় আয়ের (জিডিপি) হিসেবে তা ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বড় বাজেটে সীমিত বরাদ্দ মাত্র। সরকারের অঙ্গীকার এবং আন্তর্জাতিক মানের দিকে তাকালে এ বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য।
তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সব ক্ষেত্রেই মজুরি ও বেতন এবং প্রশাসনিক ব্যয় খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় বরাদ্দ মাথাপিছু অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি না করায় মূল্যস্ম্ফীতি বিবেচনায় তার ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নন-এমপিও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ ছয় হাজার ও স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসার ৬১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে মোট ৭৫ কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছিল অপর্যাপ্ত। এ খাতে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃশর্ত সুদবিহীন শিক্ষাঋণ প্রবর্তন করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার বড় বেশি প্রয়োজন এখন। বাজেটে এসবের কিছুই নেই।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ সমকালকে বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের গুরুত্ব আমরা নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। তারা বুঝতেই চান না যে, শিক্ষা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও কর্মস্থান সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, শিক্ষার বাজেটকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। যেমন প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নয়। এই দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় আছে কিনা তাও আমরা জানি না। আবার যেমন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য যা বরাদ্দ হয় তা খরচ করতে গেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আবার অনুমোদন নিতে হয়। এতে আমলাতান্ত্রিকতাই কেবল বাড়ে। এক্ষেত্রে ব্যয়ের সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ব্যয় করার বিধান থাকলেই চলত।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, করোনাকালে বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কন্যাশিশু এবং ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের আবার ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ বাজেটে রয়েছে, আমরা তা জানি না। বাজেট তৈরির আগে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদদের সঙ্গে সরকার বসতে পারত, পরামর্শ নিতে পারত। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে এটি হয়নি। এই বরাদ্দ দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না।
ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে আসছে। একই দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষাবিদরাও। কয়েক বছর ধরেই শিক্ষায় বরাদ্দ ১৫ শতাংশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে একক খাত হিসেবে শিক্ষায় বরাদ্দ ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
ঢাকা শিক্ষাবোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মো. ফজর আলী সমকালকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন সর্বাধিক। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যয় সর্বনিম্ন এবং এ দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে পিছিয়ে। তাই সর্বাধিক মাথাপিছু আয় কথাটি বাস্তবে অর্থবহ থাকছে না। তাই সমাজব্যবস্থার কার্যকর পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা খাতে সরকারের আরও বেশি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন