সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা পরিস্থিতি যেভাবে খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাতে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শুক্রবারের সমকালের প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, রাজশাহী ও খুলনায় করোনা সংক্রমণ ঢাকাকেও ছাড়িয়েছে গেছে। বলাবাহুল্য, দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সীমান্তের জেলাগুলোতে প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে কেবল পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেই নয়, গোটা দেশেই করোনা পরিস্থিতি পুনরায় খারাপের দিকে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা বিস্মিত, বিশেষজ্ঞ কমিটি করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সীমান্তের সাত জেলায় গত মাসে লকডাউনের সুপারিশ করেছিল। শুক্রবার থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে আগেই লকডাউন দেওয়া হয়েছিল এবং এর বাইরে কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন লকডাউন ঘোষণা করেছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা আগেও বলেছি, করোনার ভারতীয় ধরন মোকাবিলায় বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সর্বাগ্রে সীমান্তেই নজর দিতে হবে। যদিও ইতোমধ্যে সরকার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল ও আকাশ যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তারপরও কিন্তু দুই দেশের মধ্যকার আমদানি-রপ্তানি চলছে। এমনকি ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিরাও আসছেন। তাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা যথাযথভাবে পালিত না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমরা চাই পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশকৃত প্রতিটি জেলায় কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হোক। কেবল নামে বিধিনিষেধ নয় বরং স্থানীয় সব অফিস-আদালত, পরিবহন ও চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে লকডাউন কঠোর করা হোক। সংশ্নিষ্ট জেলাগুলোতে পরিস্থিতি অবনতির সঙ্গে যে স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিয়েছে সেদিকেও নজর দেওয়া চাই। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো হাসপাতালে শয্যা সংকটে রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে; যেখানে হাসপাতালটির নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছে।

শয্যা সংখ্যা বাড়িয়েও রোগী সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। শয্যা সংকটে খুলনায়ও করোনা হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় সংশ্নিষ্ট জেলাগুলোতে স্বাস্থ্য বিপর্যয় যাতে সামাল দেওয়া যায় সে জন্য হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে হোক কিংবা অবস্থার আলোকে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন জরুরি হলে সেই ব্যবস্থাই নেওয়া প্রয়োজন। ওই জেলাগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল পাঠানো ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদানের কথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সমকালকে বলেছেন। আমরা তার এ বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। এটা স্বতঃসিদ্ধ, সীমান্তবর্তী জেলাগুলো স্বাস্থ্যসহ নানা দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সীমান্তে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সহযোগী এক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতে স্ট্ক্রিনিং সুবিধাসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অর্থ বরাদ্দ দিলেও এক বছরেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সে কাজ শুরুই করতে পারেনি।

এমনকি করোনা দুর্যোগের আগে ২০১৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বন্দরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষার অবকাঠামো ও সেবাদানের কর্মসূচি গ্রহণ করলেও এ কর্মসূচির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগই খরচ হয়েছে প্রশিক্ষণে; অন্যান্য কাজ হয়েছে সামান্যই। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা নাজুক হতো না। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সীমান্তের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে সময়ক্ষেপণ না করে। এ জন্য সরকারের নেওয়া কর্মসূচিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। সীমান্তের জেলাগুলোতে করোনা পরিস্থিতির উত্তরণে প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট এলাকার স্থানীয়দেরও দায়িত্ব কম নয়। এ সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ ঘরে অবস্থানের মধ্যেই নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিষয় : করোনা ঝুঁকি সীমান্ত অঞ্চল সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন